ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে রমরমিয়ে শিশু নির্যাতনমূলক কনটেন্ট! মেটা ও ৮ রাজ্যের ডিজিপি-কে কড়া নোটিস মানবাধিকার কমিশনের

সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলিতে পর্নোগ্রাফি, বয়স-অনুপযোগী এবং শিশুদের যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্ট বা সিএসএএম (CSAM)-এর অবাধ প্রচার ও বাণিজ্য নিয়ে এবার অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করল জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (NHRC)। এই গুরুতর অপরাধমূলক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মেটা (Meta) কর্তৃপক্ষ এবং দেশের মোট আটটি রাজ্যের পুলিশ প্রধানদের (DGP) কাছে আনুষ্ঠানিক নোটিস পাঠানো হয়েছে কমিশনের পক্ষ থেকে। শিশুদের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই পদক্ষেপে রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষমহলেও চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
কমিশনের বিশিষ্ট সদস্য প্রিয়ঙ্ক কানুনগো সম্প্রতি একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় জানান যে, ইনস্টাগ্রাম বা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে অর্থের বিনিময়ে শিশু যৌন নিপীড়নমূলক সামগ্রী বা ছবি সরবরাহ করার মতো ঘটনা ভারতের প্রচলিত শিশু সুরক্ষা এবং পকসো (POCSO) আইনের অধীনে অত্যন্ত গুরুতর এবং কঠোরভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, এই ধরনের আপত্তিকর কনটেন্টগুলির বিরুদ্ধে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ অপরাধমূলক তদন্ত শুরু করা জরুরি এবং প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে মেটা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সরাসরি এফআইআর (FIR) দায়ের করতে হবে। রাজ্যগুলির পুলিশ প্রধানদের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক (MeitY)-কেও এই আইনি প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার করা হয়েছে।
মানবাধিকার কমিশনের তরফে ইতিমধ্যেই তদন্তকারী কর্তৃপক্ষগুলির হাতে প্রায় ৫০টি নির্দিষ্ট ইউআরএল (URL) এবং আপত্তিকর ওয়েবসাইটের লিঙ্ক তুলে দেওয়া হয়েছে। প্রিয়ঙ্ক কানুনগো অত্যন্ত সতর্কবার্তার সুরে জানিয়েছেন যে, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ হিসেবে এই ৫০টি ইউআরএল সরবরাহ করার পরেও যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা রাজ্য পুলিশ তদন্ত শুরু করতে গড়িমসি করে, তবে এনএইচআরসি সরাসরি ভারত সরকারের সর্বোচ্চ মহলের দ্বারস্থ হবে। এমনকি পুলিশ আধিকারিক এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট আমলাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য কেন্দ্রের কাছে জোরালো সুপারিশ করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
কমিশনের এই নজিরবিহীন কড়া পদক্ষেপের নেপথ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রকাশিত দুটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন। প্রথমত, গত মাসে বিবিসি (BBC)-র একটি রিপোর্টে প্রকাশ্যে আসে যে, ভারতে শিশুদের যৌন নিপীড়নমূলক ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ইনস্টাগ্রামে দেদার বিজ্ঞাপন চালানো হচ্ছে। ‘রেপ ভিডিও’-র মতো আপত্তিজনক শব্দ ব্যবহার করে সাধারণ ব্যবহারকারীদের টেলিগ্রাম চ্যানেলের দিকে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে এবং টাকার বিনিময়ে আপত্তিকর পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট বিক্রি করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পত্রিকা ‘ওয়্যার্ড’ (WIRED)-এর তদন্তে দেখা গেছে যে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, মেসেঞ্জার এবং থ্রেডস প্ল্যাটফর্মে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর সাহায্যে তৈরি নাবালকদের যৌন উস্কানিমূলক ছবি ও বিজ্ঞাপন প্রকাশের অনুমতি দিচ্ছে মেটা। তদন্তে উঠে এসেছে যে, এই ধরনের বিজ্ঞাপন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে মুছে ফেলার আগেই ইউরোপের হাজারেরও বেশি ব্যবহারকারী তা দেখে ফেলেছেন। এছাড়া প্রযুক্তি ব্যবহার করে পোশাক বিকৃত করার ‘এআই নুডিফাই’ (AI Nudify)-এর মতো বিপজ্জনক টুলের বিজ্ঞাপনও মেটার প্ল্যাটফর্মে রমরমিয়ে চালানো হয়েছে।
এই গুরুতর অভিযোগ এবং দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠার পর সম্প্রতি মেটা প্রধান মার্ক জুকারবার্গ তাঁদের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে শিশু নির্যাতন সামগ্রী প্রকাশ, ডিপফেক কনটেন্ট এবং সামগ্রিক পরিচালনগত ব্যর্থতার জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছেন। ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব ও তথ্যপ্রযুক্তি সচিবের সাথে মেটার শীর্ষ আধিকারিকদের একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ বৈঠকের পরেই এই ক্ষমা প্রার্থনার ঘটনা ঘটে। যদিও মেটা কর্তৃপক্ষের দাবি যে শিশু শোষণের বিরুদ্ধে তাদের কঠোর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে এবং ক্ষতিকারক বিজ্ঞাপন ও এআই কনটেন্ট ব্লক করতে তারা আরও উন্নত অ্যালগরিদম ব্যবহার শুরু করেছে, তবুও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে কেবল ফাঁকা প্রতিশ্রুতি বা মৌখিক ক্ষমা প্রার্থনা যথেষ্ট নয়, অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ফৌজদারি পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে।