বইয়ের বদলে হাতে রক্তের দাগ! দুর্গাপুরে নাবালক স্কুলছাত্রদের রক্ত বিক্রির ভয়ংকর চক্রে গ্রেফতার ৩ পাণ্ডা

শৈশবে হাতে বই-খাতা থাকার কথা, অথচ অর্থের প্রলোভন ও সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে কোমলমতি নাবালক স্কুলছাত্রদের রক্ত বিক্রির এক ভয়ংকর চক্রের সন্ধান মিলল। এই অমানবিক ও বেআইনি চক্র ভাঙতে অবশেষে বড়সড় সাফল্য পেয়েছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাতে দুর্গাপুর থানার পুলিশ অভিযান চালিয়ে এই চক্রের তিন পাণ্ডাকে গ্রেফতার করেছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, দুর্গাপুর স্টিল টাউনশিপ এলাকার একটি নামী স্কুলের নাবালক পড়ুয়াদের প্রধান টার্গেট করেছিল এই চক্র। আইনের চোখে তারা অপ্রাপ্তবয়স্ক হলেও, আধার কার্ড-সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র বিকৃত করে তাদের ‘প্রাপ্তবয়স্ক’ সাজানো হত। এরপর দুর্গাপুরের বিধাননগর অঞ্চলের একটি বেসরকারি হাসপাতালের ব্লাড ব্যাঙ্কে নিয়ে গিয়ে তাদের শরীর থেকে রক্ত বের করে নেওয়া হচ্ছিল। এর বিনিময়ে ওই পড়ুয়াদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হত মাত্র ২০০ থেকে ৫০০ টাকা।
গত কয়েকদিনে বেশ কয়েকজন অভিভাবক দুর্গাপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করার পরেই এই ভয়ঙ্কর অপকর্ম প্রকাশ্যে আসে। দ্রুত তদন্তে নেমে দুর্গাপুর থানার পুলিশ বৃহস্পতিবার রাতে অমিত প্রসাদ, মহম্মদ হাবিবুল্লাহ এবং এক নাবালককে গ্রেফতার করে। এর আগে ধৃত একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির এক ছাত্র বলেছিল, “আমার মূল কাজ স্কুলছাত্রদের রক্তদান করানো এবং তাদের দুর্গাপুরের বেসরকারি হাসপাতালের ব্লাড ব্যাঙ্কে হাজির করা। প্রতিটি ডোনারকে ২০০ টাকা করে দিয়েছি।” মালদার বাসিন্দা হাবিবুল্লাহ দুর্গাপুরের একটি হোটেলে কাজ করত এবং অমিতও দুর্গাপুরের স্থানীয় বাসিন্দা। পুলিশ সূত্রে খবর, এই দু’জনও অন্য নাবালকদের এই অন্ধকার জগতে টেনে এনেছিল।
এই রক্ত বিক্রির চক্রের অন্যতম অভিযুক্ত শেখ হাবিবুল্লার স্ত্রী দিলরুবা খাতুন দাবি করেছেন যে তাঁর স্বামী নির্দোষ। তবে বৃহস্পতিবার নতুন করে আরও তিন অভিভাবক থানায় অভিযোগ দায়ের করার পর পুলিশি তদন্ত আরও জোরদার করা হয়েছে। এখনও পর্যন্ত অন্তত ছ’জন নাবালক ছাত্রের সন্ধান মিলেছে, যাদের এই চক্রের বলি বানানো হয়েছে। ঘটনার গুরুত্ব বুঝে আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের তৎপরতা তুঙ্গে উঠেছে। আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের ডেপুটি কমিশনার (পূর্ব) রসপ্রীত সিং স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, এই চক্রের সঙ্গে আরও কারা জড়িত, তার খোঁজ নেওয়া হচ্ছে এবং কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে, বিষয়টি সামনে আসতেই নড়েচড়ে বসেছে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরও। বিধাননগরের ওই বেসরকারি হাসপাতালের ব্লাড ব্যাঙ্কে হানা দেয় দফতরের একটি বিশেষ প্রতিনিধি দল। ব্লাড ব্যাঙ্কের সমস্ত নথি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং এই অবৈধ কারবারে হাসপাতালের ভেতরের কেউ যুক্ত কি না, তা খতিয়ে দেখে খুব শীঘ্রই স্বাস্থ্য দফতরে রিপোর্ট জমা দেওয়া হবে। স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা দেবযানী বসু গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে এই চক্রের জাল অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। নিরপেক্ষ তদন্ত হলে দেখা যাবে দুর্গাপুরের আরও অনেক স্কুলের ছাত্র এই চক্রের জালে জড়িয়ে পড়েছে। প্রশাসনের কড়া বার্তার পাশাপাশি অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন দুর্গাপুরের সাধারণ মানুষ ও সচেতন অভিভাবকরা।