রাজীব গান্ধী আমলের বিতর্কিত বোফর্স মামলা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বড় রায়, জেনে নিন সব খুঁটিনাটি

ভারতের রাজনীতিতে স্বাধীনতার পরবর্তীকালের অন্যতম বড় রাজনৈতিক বিতর্ক ও কেলেঙ্কারি হিসেবে পরিচিত ‘বোফর্স দুর্নীতি মামলা’ নতুন করে শুরু করার আবেদন খারিজ করে দিল সুপ্রিম কোর্ট। বিজেপি নেতা ও আইনজীবী অজয় কে আগরওয়ালের করা এই আবেদন শীর্ষ আদালত নাকচ করে দেওয়ায়, ঐতিহাসিক এই মামলাটি পুনরায় চালুর সমস্ত সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে গেল বলেই মনে করছেন আইনি বিশেষজ্ঞরা।

সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ

বিচারপতি জে. বি. পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে. বিনোদ চন্দ্রনের ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হয়। শুনানির শুরুতেই আবেদনকারীর উদ্দেশ্যে আদালত প্রশ্ন তোলে, এতদিন পর পুরোনো এই মামলাটি টেনে নিয়ে আসার আর কী যৌক্তিকতা রয়েছে?

আবেদনকারী অজয় কে আগরওয়াল মামলার নথি থেকে প্রয়াত শ্রীচাঁদ পি হিন্দুজা ও গোপীচাঁদ পি হিন্দুজার নাম বাদ দেওয়ার জন্য চার সপ্তাহ সময় প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু ডিভিশন বেঞ্চ সেই আবেদন সম্পূর্ণ মঞ্জুর করতে অস্বীকার করে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, মামলাটি বহু বছর ধরে ঝুলে রয়েছে এবং আর অতিরিক্ত দেরি করা সম্ভব নয়। বিচারপতি পারদিওয়ালা উল্লেখ করেন, ২০০৫ সালেই দিল্লি হাইকোর্ট এই মামলা খারিজ করে দিয়েছিল এবং পরবর্তীকালে সিবিআইয়ের আপিলেও কোনো সুফল মেলেনি। ফলে এখন এই মামলায় নতুন করে বিচার করার আর কোনো অবকাশ নেই।

দিল্লি হাইকোর্টের পুরোনো রায় ও সিবিআইয়ের ব্যর্থতা

  • ২০০৫ সালের রায়: ২০০৫ সালে দিল্লি হাইকোর্ট হিন্দুজা গোষ্ঠীর তিন কর্ণধার—শ্রীচাঁদ, গোপীচাঁদ ও প্রকাশ হিন্দুজা এবং সুইডিশ অস্ত্র নির্মাণকারী সংস্থা ‘এবি বফর্স’-এর বিরুদ্ধে চলা সমস্ত ফৌজদারি মামলা খারিজ করে দিয়েছিল।

  • তথ্যপ্রমাণের অভাব: আদালতের মূল পর্যবেক্ষণ ছিল, ১৯৮৬ সালের বফর্স চুক্তিতে হিন্দুজা গোষ্ঠী ঘুষ নিয়েছিল—এই মর্মে সিবিআই কোনো গ্রহণযোগ্য বা শক্তপোক্ত তথ্যপ্রমাণ পেশ করতে ব্যর্থ হয়েছে। সিবিআই সুইডিশ প্রশাসনের যে নথিপত্রগুলি জমা দিয়েছিল, সেগুলি ‘মূল’ (অরিজিনাল) নথি না হওয়ায় আদালত তা খারিজ করে দেয়।

  • সিবিআইয়ের বিলম্বে আপিল: ২০১৮ সালে দিল্লি হাইকোর্টের ওই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল সিবিআই। কিন্তু শীর্ষ আদালত প্রশ্ন তুলেছিল যে, ২০০৫ সালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে তদন্তকারী সংস্থার ৪,৫২২ দিন অতিরিক্ত সময় লাগল কেন? সেই দীর্ঘ বিলম্বের কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যাও দিতে পারেনি সিবিআই।

বোফর্স কেলেঙ্কারির প্রেক্ষাপট

উল্লেখ্য, ১৯৮৬ সালের ২৪ মার্চ সুইডিশ সংস্থা ‘এবি বোফর্স’-এর সঙ্গে ১,৪৩৭ কোটি টাকার চুক্তিতে মোট ৪০০টি হাউইৎজার কামান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তৎকালীন রাজীব গান্ধী সরকার। কিন্তু এর ঠিক এক বছর পর, ১৯৮৭ সালে সুইডিশ রেডিওর একটি বিস্ফোরক প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে, উক্ত চুক্তি পাইয়ে দেওয়ার জন্য ভারতীয় রাজনীতিক ও প্রতিরক্ষা আধিকারিকদের মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়েছিল ওই অস্ত্র প্রস্তুতকারক সংস্থা। দেশজুড়ে শোরগোল ফেলে দেওয়া এই বোফর্স কেলেঙ্কারির জট কাটাতে দীর্ঘ দশক পেরিয়ে গেলেও, সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান রায়ে এই আইনি অধ্যায়ের কার্যত চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটল।