দুর্নীতির কাদা সরাতে কত সময় লাগবে? দিলীপ ঘোষের বিস্ফোরক মন্তব্যে রাজ্য রাজনীতিতে চরম শোরগোল

অন্নপূর্ণা যোজনার আর্থিক সহায়তা সময়মতো না পৌঁছনোয় সাধারণ মানুষের মনে যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছিল, তার প্রেক্ষিতে রাজ্য রাজনীতিতে উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। গত ৮ অগস্ট মুখ্যমন্ত্রী অন্নপূর্ণা যোজনার বকেয়া টাকা সংক্রান্ত বিষয়ে মুখ খুলেছিলেন এবং আশ্বাস দিয়েছিলেন যে আগামী ১৭ অগস্ট থেকে উপভোক্তাদের অ্যাকাউন্টে ৩,০০০ টাকা করে পাঠানো শুরু হবে। এই আবহে এবার বিষয়টিতে স্পষ্ট অবস্থান নিলেন রাজ্যের পঞ্চায়েত মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। সম্প্রতি নবান্নে খোলা হেল্পলাইন নম্বরে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা সংক্রান্ত নানা অভিযোগ জমা পড়ছে, যার জেরে প্রশাসনের অন্দরেও তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই প্রসঙ্গে মুখ খুলে পঞ্চায়েত মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তীব্র আক্রমণ শানান। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ কেবল নিজেরা অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা সময়মতো পাবেন কি না তা নিয়েই বেশি চিন্তিত, অথচ দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। তাঁর অভিযোগ, দুর্নীতির সঙ্গে বহু মানুষ ওতপ্রোতভাবে যুক্ত রয়েছে। বাড়ির প্ল্যান পাশ করানো থেকে শুরু করে খাল-বিল ও রাস্তা নির্মাণের কাজেও ব্যাপক দুর্নীতি ও টাকা লেনদেন হয়েছে। এই প্রসঙ্গে তিনি আরও যোগ করেন যে, ঘুষ যে দেয় এবং যে নেয়—উভয় পক্ষই সমানভাবে দোষী। সরকারের পক্ষ থেকে রাজ্যবাসীর কল্যাণে কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে মুখ্যমন্ত্রী নিজে ময়দানে নেমে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে রাতারাতি পরিস্থিতি বদলে ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তোলা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করে তিনি জানান যে, বিগত বহু বছরের জমানো জঞ্জাল ও দুর্নীতির কাদা পরিষ্কার করতে কিছুটা সময় লাগবেই।
অন্যদিকে, রাজ্য রাজনীতিতে সম্প্রতি জল্পনা শুরু হয়েছে যে তবে কি তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাকর্মীদের জন্য বিজেপির সমস্ত দরজা খুলে দেওয়া হচ্ছে? এই গুঞ্জন ও জল্পনা পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়ে দিলীপ ঘোষ অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানান যে, দলীয় নির্দেশ অমান্য করে কেউ যদি তৃণমূলের কাউকে দলে যোগদান করানোর চেষ্টা করে, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখনও পর্যন্ত কাউকে দলে নেওয়া হয়নি, তবে করানোর চেষ্টা করায় ইতিমধ্যেই প্রায় আড়াইশো জন বিজেপি কর্মীকে দলীয়ভাবে শোকজ করা হয়েছে এবং তিরিশজনকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, কারুর জন্য বিজেপির দরজা খোলা হয়নি এবং দলের গ্রাসরুট লেভেলের কর্মীরা কখনই এই ধরনের পদক্ষেপ মেনে নেবে না। যে তৃণমূলের বিরুদ্ধে তারা দীর্ঘকাল লড়াই চালিয়ে গেছেন, যাদের অত্যাচারে ঘরছাড়া হতে হয়েছে, হাত-পা ভাঙতে হয়েছে, মাথা ফেটেছে কিংবা যে আড়াইশো বিজেপি কর্মী শহিদ হয়েছেন, তাদের সঙ্গীদের কোনোভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
বিজেপির নিচু তলার কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের পারদ চড়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পঞ্চায়েত মন্ত্রী জানান যে রাজনৈতিক মহলে পারস্পরিক মেলামেশা বা ওঠাবসা থাকতেই পারে। তাঁর কথায়, পাশের বাড়ির কোনো তৃণমূল কর্মীর সঙ্গে কি কথা বলা যাবে না? এই ধরনের সংকীর্ণ রাজনীতি তিনি ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করেন না। তৃণমূলের বহু বিধায়ক ও সাংসদের সঙ্গেই তাঁর সুসম্পর্ক রয়েছে বলে জানান তিনি। তবে বর্তমানে দলের উচ্চস্তরের কেউ কেউ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বা আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন যে বিজেপি একটি সর্বভারতীয় দল এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন, তা যেমন রাজ্য স্তরে মানা হবে, তেমনই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকেও এখানকার বাস্তব পরিস্থিতি মাথায় রেখেই এগোতে হবে। পরিশেষে তিনি দৃঢ়কণ্ঠে জানান যে দলের নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না এবং এই ধরনের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির জেরে বিজেপি রাজনৈতিকভাবে দুর্বল বা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং দেশজুড়েই এই শৃঙ্খলাবদ্ধ কাঠামোর মাধ্যমেই সরকার পরিচালিত হয়।