দিল্লির মেয়ে এবার সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে! ভিন্দেশে বিচারপতির মুকুট পরে কাঁপালেন কোন ভারতীয় নারী?

দিল্লিতে জন্ম এবং জাম্বিয়ায় শৈশব কেটে যাওয়া বিচারপতিা আভা নায়ার প্যাটেল এক ইতিহাস সৃষ্টি করে বিশ্বমঞ্চে ভারতের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। তিনি জাম্বিয়া সুপ্রিম কোর্টের প্রথম মহিলা বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়ে অনন্য নজির গড়েছেন। পাশাপাশি, ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের বিশেষ আমন্ত্রণে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের মর্যাদাপূর্ণ বিচারিক পিঠে বসার গৌরব অর্জনকারী জাম্বিয়ার প্রথম কোনো বিচারপতি হিসেবেও তিনি ইতিহাস রচনা করেছেন।
১৯৭৩ সালে মাত্র সাত বছর বয়সে আভা নায়ার তাঁর পরিবারের সঙ্গে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে দিল্লি থেকে জাম্বিয়ায় পাড়ি জজম করেছিলেন। জাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পর তিনি যুক্তরাজ্যের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে তিনি জাম্বিয়া বারে যোগদান করেন। একটি পুরুষ-প্রধান আইনি পেশার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েও তিনি নিজের অখণ্ড সততা, আপসহীন নিষ্ঠা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে শীর্ষস্থান অধিকার করেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনের সিঁড়ি বেয়ে ২০১৯ সালে তিনি হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে উন্নীত হন এবং ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে তাঁকে আপিল আদালতের বিচারপতি করা হয়। অবশেষে চলতি বছরের ২৭ মে তিনি জাম্বিয়ার সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। আইনি অঙ্গনের বাইরেও তিনি একজন অদম্য সাহসী পর্বতারোহী, যিনি আফ্রিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ‘মাউন্ট কিলিমঞ্জারো’ সফলভাবে ফতেহ করেছেন।
সুপ্রিম কোর্ট অ্যাডভোকেটস-অন-রেকর্ড অ্যাসোসিয়েশন বা এসসিএওআরএ আয়োজিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিচারপতি আভা নায়ার প্যাটেল অত্যন্ত জোরালো ভাষায় জানান যে, আধুনিক বিচার ব্যবস্থা এবং ন্যায়বিচার বিতরণের ক্ষেত্রে ‘ইনোভেশন’ বা নতুন উদ্ভাবন, ‘ইন্টিগ্রিটি’ বা অটল সততা এবং ‘ইনক্লুসিভিটি’ বা সর্বাত্মক অন্তর্ভুক্তি—এই তিনটি মূল স্তম্ভ সবচেয়ে বেশি অপরিহার্য। এই তিনটি উপাদান একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, বিচার ব্যবস্থায় যেকোনো নতুন প্রযুক্তি বা পরীক্ষামূলক প্রয়োগ তখনই সফল বলে বিবেচিত হবে, যখন তা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সহজে ন্যায়বিচার পৌঁছে দিতে সক্ষম হবে। ভারত সফরে এসে তিনি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ কন্ঠে বলেন যে, জন্মভূমি ভারতকে তিনি কখনো মন থেকে দূরে সরিয়ে রাখেননি।
বিচার প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ক্রমবর্ধমান ব্যবহার প্রসঙ্গে তীব্র সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে তিনি বলেন যে, বিচার বিতরণ ব্যবস্থায় কোডিং বা অ্যালগরিদমের আধিপত্য বাড়লে অতীতে চলে আসা বিভিন্ন ঐতিহাসিক পক্ষপাতিত্বও তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়তে পারে।
একই অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বলেন যে, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন ভারতের সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার পথকে আগের তুলনায় অনেক বেশি সহজ, সুলভ ও কম ব্যয়বহুল করে তুলেছে। দেশের দূরদূরান্তের মানুষ আজ কোনো দীর্ঘ ভ্রমণ ছাড়াই ঘরে বসে আদালতের কার্যক্রমে সরাসরি অংশ নিতে পারছেন। তবে প্রধান বিচারপতি আরও সতর্ক করে বলেন যে, এআই বিচারিক প্রক্রিয়াকে উন্নত করতে সহায়তা করলেও তা কখনো একজন মানুষের বিচারবুদ্ধি বা মানবিক অনুভূতির বিকল্প হতে পারে না। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে শেষ পর্যন্ত সহানুভূতি, গভীর আইনি বিবেক এবং যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্তের ওপরই ভরসা রাখতে হয়।