দেউচা কি শুধু ‘পাথর খনি’ হয়ে থাকবে? মমতার স্বপ্নের প্রকল্প নিয়ে বিরোধী-প্রশ্নে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি

বীরভূমের দেউচা-পাচামি কয়লা খনি প্রকল্পকে ঘিরে আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামগুলিতে অসন্তোষ ক্রমশ বাড়ছে। এশিয়ার বৃহত্তম কয়লা খনি হওয়ার স্বপ্ন এখনও বিশ-বাঁও জলে, কিন্তু দ্রুত গতিতে বেড়ে চলেছে প্রাথমিক পর্যায়ের ব্যাসল্ট শিলা উত্তোলনের পরিধি। প্রথম পর্যায়ে ১২ একরের পর এবার আরও প্রায় ৩১৫ একর (৩১৪.৭৮ একর) জমিতে দ্বিতীয় পর্যায়ের খনন কাজ শুরু করতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগম লিমিটেড (ডব্লিউবি-পিডিসিএল)।
আতঙ্কের পরিবেশ: বসতি হারানোর ভয়
খনন কাজের এই সম্প্রসারণ এলাকার আদিবাসী মানুষজনের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, এভাবেই খননের পরিধি বৃদ্ধি পেতে পেতে একসময় তাদের বসতির উপরও কোপ পড়বে।
দেউচার আদিবাসী বাসিন্দারা প্রথম থেকেই এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে। তাঁদের যুক্তি, ৩,৪০০ একর জমিজুড়ে প্রস্তাবিত এই খোলামুখ কয়লা খনির জন্য প্রায় ২০টি গ্রামের কমপক্ষে ২১ হাজার মানুষের বসতি অন্যত্র সরাতে হবে। এর ফলে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল, চাষযোগ্য জমি এবং জলাভূমি ধ্বংসের পাশাপাশি জলস্তরও নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেউচার বাসিন্দা লক্ষ্মী মুর্মু, দেবু সরেন এবং কাবেরী মাড্ডিরা ইটিভি ভারতকে বলেন, “এভাবে খননের কাজ বাড়তে থাকলে এক সময় আমাদের গ্রামগুলো শেষ হয়ে যাবে। জমি দিয়ে দিলে আমাদের পরের বংশধররা কী করবে? তবে যদি গ্রামে খনন কাজ করতে আসে, তবে বৃহত্তর আন্দোলন হবে।”
পুলিশ ও গোয়েন্দাদের নজরদারি: চাপা পড়ছে বিক্ষোভ
যদিও, এই চরম অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসছে না। দেউচা-পাচামিতে আন্দোলন রুখতে প্রথম থেকেই কড়া পুলিশি নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা নজরদারি রাখা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মিথ্যা মামলা দেওয়ার এবং মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হচ্ছে। ফলে অসন্তোষ থাকলেও আদিবাসী মানুষজন প্রকাশ্যে পথে নেমে বিক্ষোভ-আন্দোলন করতে পারছেন না। “একটা আতঙ্কের পরিবেশ দেউচায়,” অভিযোগ করেন তাঁরা।
কয়লা উত্তোলন কবে? উত্তর নেই প্রশাসনের কাছে
দেউচা-পাচামিতে ১২৪০ মিলিয়ন টন কয়লা এবং ২৬০০ মিলিয়ন টন বেসাল্ট মজুত রয়েছে। কয়লার স্তরে পৌঁছানোর আগে ১,১৩৮ মিলিয়ন হেক্টর ব্যাসল্ট শিলা সরাতে হবে। সেই কারণেই শিলা উত্তোলনের কাজ শুরু হয়েছে। তবে জেলা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা এই প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করতে নারাজ। তাঁদের বক্তব্য, সমগ্র বিষয়টি ডব্লিউবি-পিডিসিএল দেখভাল করছে। কয়লা উত্তোলন কবে শুরু হবে, তার কোনো সদুত্তর না মেলায় স্থানীয়দের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
বিরোধীদের বড় অভিযোগ: ‘কয়লা নয়, শুধু পাথর উত্তোলন’
অন্যদিকে, এই প্রকল্প নিয়ে শুরু থেকেই সরব বিজেপি ও সিপিআইএম। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং সিপিআইএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম অভিযোগ করেছেন যে, দেউচা-পাচামি প্রকল্প সংক্রান্ত কোনো সরকারি তথ্য নেই এবং কেন্দ্র সরকারের কাছ থেকে ছাড়পত্রও নেওয়া হয়নি। তাঁদের অভিযোগ, আসলে কয়লা খনির নামে দেউচায় শুধু পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে।
রাজ্য সরকার যদিও এই দেউচা-পাচামি প্রকল্পকে ‘বাংলার উন্নয়নের অনুঘটক’ হিসেবে ঘোষণা করেছে, তবে প্রকল্পের অস্বচ্ছতা ও স্থানীয়দের চাপা অসন্তোষ বড়সড়ো আন্দোলনের জন্ম দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।