জুনেই আসছে সেই মোক্ষম সুযোগ! এভিয়ান-লে-বেঁ শহরে ট্রাম্পের জন্য কোন সারপ্রাইজ প্ল্যান রেডি রাখছেন মোদী?

বিশ্ব রাজনীতির দুই মহাশক্তিধর রাষ্ট্রনেতা—ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে শুরু করে ওয়াশিংটন ডিসি পর্যন্ত সর্বত্র এখন একটিই প্রশ্ন, আবার কবে একফ্রেমে দেখা যাবে এই দুই বিশ্বনেতাকে? কূটনৈতিক সূত্রের সাম্প্রতিক ইঙ্গিত অনুযায়ী, আগামী জুন মাসেই ইউরোপের মাটিতে এক ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মুখোমুখি হতে পারেন মোদী ও ট্রাম্প। এই হাই-ভোল্টেজ জল্পনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফ্রান্স, কারণ আগামী জুন মাসে ফ্রান্সেই অনুষ্ঠিত হতে চলেছে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাষ্ট্রজোট জি-৭ (G7)-এর বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন। এই মেগা সম্মেলনে দুই নেতারই উপস্থিত থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, যা ভারত-মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন মসনদে দ্বিতীয়বার বসার পর প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে তাঁর শেষ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি, হোয়াইট হাউসে। তারপর থেকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে একাধিক পরিবর্তন এসেছে। এবার সেই সমীকরণকে আরও একধাপ এগিয়ে নিতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ অনুঘটকের ভূমিকা পালন করছেন। চলতি ২০২৬ সালের শুরুর দিকে, গত ১৭ থেকে ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সফরে ভারতে এসেছিলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। সেই সময় নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মাঝেই তিনি ভারতকে এই উচ্চ-পর্যায়ের জি-৭ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য বিশেষ আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ভারতের ফরাসি দূতাবাস ইতিমধ্যেই নিশ্চিত করেছে যে, প্রধানমন্ত্রী মোদী এই আমন্ত্রণ সানন্দে গ্রহণ করেছেন এবং তাঁর ফ্রান্স সফর সম্পূর্ণ নিশ্চিত। অন্যদিকে, হোয়াইট হাউস সূত্রের খবর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এই সম্মেলনে যোগ দিতে ফ্রান্সে যাচ্ছেন। ফলে স্বভাবতই দুই বন্ধু দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের মুখোমুখি হওয়ার মোক্ষম সুযোগ তৈরি হচ্ছে ফরাসি ভূমিতে।
এবারের জি-৭ সম্মেলনটি আগামী ১৫ থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত ফ্রান্সের অত্যন্ত মনোরম ও বরফাবৃত আল্পস পর্বতমালায় অবস্থিত বিখ্যাত ‘এভিয়ান-লে-বেঁ’ (Evian-les-Bains) শহরে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও কূটনৈতিক মহলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই সম্মেলনে বেশ কিছু বৈপ্লবিক এজেন্ডা নিয়ে হাজির হচ্ছেন। তিনি মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বা এআই-এর বিশ্বব্যাপী নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শুল্ক এবং অপরাধ দমনে বিশ্বব্যাপী গৃহীত কড়া পদক্ষেপসমূহ সংক্রান্ত আলোচনার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক এবং নজরকাড়া বিষয় হল, আগামী ১৪ জুন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ৮০তম জন্মদিন। অর্থাৎ, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই ল্যান্ডমার্ক জন্মদিনের ঠিক একদিন পরেই ফরাসি আল্পসের এই ঐতিহাসিক সম্মেলনটি শুরু হতে চলেছে। ফলে এই সম্মেলন যে শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক মিডিয়ার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে, তা বলাই বাহুল্য। তবে হোয়াইট হাউসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার গোপন ইঙ্গিত অনুযায়ী, এই আসন্ন বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও বড়সড় লিখিত চুক্তি বা চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। এর পরিবর্তে, এমন একটি কৌশলগত ঐকমত্য গড়ে তোলার উপর অধিক জোর দেওয়া হবে, যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বা ভূ-রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলোর রূপরেখা নির্ধারণে গাইডলাইন হিসেবে কাজ করবে। আলোচনার টেবিলে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও ইরানের প্রসঙ্গটি থাকার প্রবল সম্ভাবনা থাকলেও, পর্যবেক্ষকদের ধারণা—প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বাণিজ্য-সংক্রান্ত বিষয়গুলোর উপরই ভারতের সঙ্গে অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করবেন।
উল্লেখ্য, জি-৭ (G7) হল বিশ্বের সাতটি সর্বাধিক উন্নত এবং শীর্ষস্থানীয় শিল্পোন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর সমন্বয়ে গঠিত একটি অত্যন্ত শক্তিশালী মঞ্চ বা জোট। এই এলিট ক্লাবের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো হল—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান এবং কানাডা। এই সাতটি পরাশক্তি দেশ ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) স্থায়ী সদস্য হিসেবে এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে থাকে। এই উন্নত দেশগুলোর তালিকায় ভারত অন্তর্ভুক্ত না হলেও, বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা এবং প্রধানমন্ত্রী মোদীর বৈশ্বিক প্রভাবের কারণেই ফ্রান্স ভারতকে বিশেষভাবে আমন্ত্রিত দেশ হিসেবে ডেকেছে। এখন দেখার, জুন মাসের এই আল্পস পর্বতের শীতল আবহাওয়ায় মোদী-ট্রাম্পের রসায়ন বিশ্ব রাজনীতিতে কতটা উষ্ণতা ছড়ায়।