পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন এবং পরবর্তী নজিরবিহীন রাজনৈতিক পালাবদলের পর ভোট-পরবর্তী হিংসা ও সিন্ডিকেট রাজের বিরুদ্ধে চরম অ্যাকশন মোডে নেমেছে রাজ্য পুলিশ ও রাজ্য প্রশাসন। এবার বিধাননগর পুরসভা এলাকা তথা রাজারহাট-গোপালপুর চত্বরে এক প্রভাবশালী প্রোমোটারের ওপর প্রাণঘাতী হামলার ঘটনায় নতুন করে জড়িয়ে গেল শাসকদলের এক হেভিওয়েট নেতার নাম। বিজেপির বিজয় মিছিল (BJP Victory Rally) থেকে ফেরার পথে এক প্রোমোটারের ওপর নৃশংস হামলার অভিযোগে বুধবার ভোররাতে অমিত চক্রবর্তী ওরফে ননী (Amit Chakraborty alias Noni) নামের এক প্রভাবশালী তৃণমূল ঘনিষ্ঠকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পুলিশি সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃত ননী বিধাননগর পুরসভার অত্যন্ত প্রভাবশালী মেয়র পারিষদ (MMIC) দেবরাজ চক্রবর্তীর ডানহাত এবং পরম ঘনিষ্ঠ বলেই রাজনৈতিক মহলে পরিচিত। ভোররাতের এই হাই-প্রোফাইল গ্রেফতারির জেরে উত্তর ২৪ পরগনা সহ সমগ্র রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নতুন করে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে।
বিধাননগর উত্তর থানার পুলিশ সূত্রে খবর, স্থানীয় এক নামী প্রোমোটারের ওপর অতর্কিতে হামলা, মারধর, প্রাণনাশের হুমকি এবং কোটি টাকা তোলাবাজি সহ একাধিক সুনির্দিষ্ট জামিন অযোগ্য ধারার অপরাধমূলক অভিযোগের ভিত্তিতেই অমিত চক্রবর্তীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বুধবার ভোরের আলো ফোটার আগেই রাজারহাটের একটি গোপন ডেরা থেকে তাঁকে হাতেনাতে পাকড়াও করে পুলিশ। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, এই একই অপরাধের ঘটনায় এর আগে বিধাননগর পুরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের দাপুটে তৃণমূল কাউন্সিলর সমরেশ চক্রবর্তী (Samaresh Chakraborty) সহ আরও দুই দুষ্কৃতীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সমরেশ ও তাঁর সহযোগীদের পুলিশি হেফাজতে নিয়ে ম্যারাথন জেরার পরেই এই হামলার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে অমিত চক্রবর্তী ওরফে ননীর নাম উঠে আসে। পুলিশের দাবি, এই চক্রের তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই একে একে কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরোনোর মতো তৃণমূলের প্রথম সারির হেভিওয়েট নেতাদের নাম ও যোগসূত্র সামনে আসছে।
ঘটনার সূত্রপাত কয়েকদিন আগে, যখন বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ঐতিহাসিক জয়ের পর এলাকায় একটি বিশাল বিজয় মিছিল বের করেছিলেন স্থানীয় বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা। অভিযোগ, সেই মহা মিছিল থেকে বাড়ি ফেরার পথে প্রোমোটার কিশোর হালদারের (Kishore Haldar) ওপর লাঠি, রড এবং আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে চড়াও হয় একদল সশস্ত্র দুষ্কৃতী। তাঁকে রাস্তায় ফেলে নৃশংসভাবে মারধর করা হয় এবং এলাকায় ব্যবসা করতে হলে মোটা অঙ্কের টাকা সিন্ডিকেটে দিতে হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় কিশোর হালদারকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপরই ওই প্রোমোটার থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন, যেখানে স্পষ্ট জানানো হয় যে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং তোলাবাজির উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালানো হয়েছে। যদিও এই হাই-প্রোফাইল গ্রেফতারির পর এখন পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) কোনো শীর্ষ নেতৃত্ব বা দলের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়নি। দল যে এই মুহূর্তে চরম অস্বস্তিতে, তা নেতাদের নীরবতাতেই স্পষ্ট।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও গোয়েন্দা রিপোর্টে উঠে এসেছে, প্রোমোটার কিশোর হালদারের ওপর ভোট-পরবর্তী হামলা ও প্রাণনাশের হুমকির ঘটনায় ধৃত অমিত চক্রবর্তী ওরফে ননীর প্রত্যক্ষ যোগসূত্র ও সুপারি ছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বিধাননগরের মেয়র পারিষদ দেবরাজের ছত্রছায়ায় থেকে এই ননী দীর্ঘদিন ধরেই রাজারহাট-নিউটাউন এবং বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকায় একচ্ছত্র তোলাবাজি সিন্ডিকেট (Extortion Racket) চালাতেন। অভিযোগ, যেকোনো নতুন আবাসন বা প্রোমোটিং ব্যবসা শুরু করতে গেলেই ননীর দফতরে লাখ লাখ টাকার কাটমানি দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। এমনকি সরকারি নির্মাণ কাজেও নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে নিম্নমানের সামগ্রী সরবরাহের জন্য বিল পাস করানোর সিন্ডিকেট চালাতেন এই ননী। রাজারহাটের ত্রাস এই ডনের গ্রেফতারে এলাকার মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও, পুলিশ মনে করছে এই চক্রের জাল আরও গভীরে বিস্তৃত। এই তোলাবাজির টাকা কোনো প্রভাবশালী মন্ত্রীর অ্যাকাউন্টে যেত কি না এবং মেগা সিন্ডিকেটের পেছনে আর কোনো বড় মাথা জড়িয়ে আছে কি না, তা জানতে ধৃত ননীকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে বড়সড় তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।





