লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ফেল, কাজে এল না নারী কার্ডও; কেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল তৃণমূল?

১৫ বছরের একচ্ছত্র আধিপত্য, ‘অপ্রতিরোধ্য’ ভাবমূর্তি এবং মা-মাটি-মানুষের স্লোগান—সবই আজ ইতিহাসের পাতায়। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে এক মহাপ্রলয় ঘটিয়ে দিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপরাজেয় দুর্গ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল বিজেপির ঝোড়ো হাওয়ায়। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন গেরুয়া শিবিরের জয় কেবল একটি রাজনৈতিক দলের হার নয়, বরং গত দেড় দশক ধরে গড়ে ওঠা একটি শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার চূড়ান্ত পতন।

দুর্নীতির বিষবাষ্প ও মধ্যবিত্তের ক্ষোভ
তৃণমূলের এই পতনের বীজ বোনা হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। ২০১৬ বা ২০২১-এ যে প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়াকে মমতা তাঁর জনকল্যাণমুখী প্রকল্প দিয়ে রুখে দিয়েছিলেন, ২০২৬-এ তা দাবানলের রূপ নেয়। নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে রেশন, কয়লা, বালি এবং গরু পাচারের মতো একের পর এক কেলেঙ্কারি জনমানসে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল। কোটি কোটি টাকা উদ্ধারের দৃশ্য সাধারণ মানুষের মনে বিশ্বাসঘাতকতার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। মধ্যবিত্ত সমাজ, যারা মেধা ও শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়, তাঁরা যখন দেখলেন যোগ্যরা রাস্তায় আর অযোগ্যরা টাকার বিনিময়ে চেয়ারে, তখন থেকেই মোহভঙ্গ শুরু হয়।

ভোটের ময়দানে এসআইআর ও জনবিস্ফোরণ
এবারের নির্বাচনে ৯০ শতাংশের বেশি ভোটদান প্রমাণ করেছে যে এটি কেবল নির্বাচন ছিল না, ছিল শাসকদলের বিরুদ্ধে এক নীরব বিপ্লব। ভোটাররা কেবল ভোট দেননি, তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশের মঞ্চ হিসেবে বুথকে ব্যবহার করেছেন। ভোটার তালিকায় স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে বিজেপির প্রস্তাবিত এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়াকে মমতা ‘ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত’ বললেও, সাধারণ মানুষ একে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ফল বলছে, ভোটার সংখ্যা কমলেও ভোটের হার বেড়েছে—যা স্পষ্টতই শাসকদলের বিরুদ্ধে গিয়েছে।

সংগঠনের ফাটল ও অভিষেকের উত্থান
তৃণমূলের অন্দরমহলে প্রবীণ বনাম নবীনের লড়াই এবং কর্পোরেট স্টাইলে দল চালানোর কৌশল হিতে বিপরীত হয়েছে। মুকুল রায়, শুভেন্দু অধিকারী বা তাপস রায়ের মতো ‘মাটির মানুষ’ নেতাদের গুরুত্ব হারানো বা দলত্যাগ তৃণমূলকে জনবিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নতুন তৃণমূল’ গড়তে গিয়ে আইপ্যাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দলের রাজনৈতিক সত্তাকে নষ্ট করেছে। সিন্ডিকেট রাজ এবং কাটমানি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নিচুতলার কর্মীদের ক্ষোভ সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে নবান্ন।

নারী ও সংখ্যালঘু ভোটের সমীকরণ বদল
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তুরুপের তাস ছিল ‘মহিলা ভোট’। কিন্তু আরজি কর কাণ্ডের পর নারী নিরাপত্তা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছিল, তার সদুত্তর দিতে পারেনি সরকার। অন্যদিকে, বিজেপি শুধু উন্নয়নের কথাই বলেনি, তারা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের পাল্টা আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মহিলাদের মন জয় করেছে। সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কেও ফাটল ধরেছে। উগ্র মেরুকরণ এবং আর্থিক অনগ্রসরতা মুসলিম ভোটারদের একটি অংশকে বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করেছে।

মমতার দ্বিতীয় ইনিংস: এবার রাজপথই ভরসা
ক্ষমতার অলিন্দ থেকে এক ধাক্কায় বিরোধী আসনে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে এখন কঠিন চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্রযন্ত্রের সাহায্য ছাড়া, ঘরোয়া বিবাদ মিটিয়ে দলকে ফের খাড়া করা কি সম্ভব? অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও এটি অগ্নিপরীক্ষা। বাংলায় তৃণমূলের একচেটিয়া আগ্রাসনের দিন শেষ। শুরু হলো এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়, যেখানে ঐতিহ্য নয়, পারফরম্যান্সই হবে শেষ কথা।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy