আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রথম পাকা চুলটা চোখে পড়লেই মন খারাপ হয়ে যায়। বয়স লুকোতে আর আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে আমাদের প্রথম গন্তব্য হয় বিউটি পার্লার। কালো, ব্রাউন কিংবা বার্গেন্ডি—মাসে একবার রং না করালে যেন চলেই না। কিন্তু ফ্যাশনের এই নেশা কি আপনার জীবনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে? দীর্ঘক্ষণ কেমিক্যাল ডাই ব্যবহারের ফলে শরীরে কী হচ্ছে, তা নিয়ে সম্প্রতি কিছু তথ্য রীতিমতো উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গবেষণার রিপোর্ট ও ক্যানসার ঝুঁকি
ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার (IARC)-এর মতে, হেয়ার ড্রেসার বা নাপিতরা যারা প্রতিদিন রাসায়নিক ডাই নিয়ে কাজ করেন, তাঁদের ব্লাডার ক্যানসারের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেকটাই বেশি। আবার ২০১৯ সালে আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ ৪৬,০০০ মহিলার ওপর একটি গবেষণা চালায়। সেখানে দেখা যায়, যারা নিয়মিত পার্মানেন্ট হেয়ার ডাই ব্যবহার করেন (বিশেষ করে কালো বা গাঢ় ব্রাউন), তাঁদের ব্রেস্ট ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় ৯% বেড়ে যায়। আফ্রিকান-আমেরিকান মহিলাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি ৬০% পর্যন্ত হতে পারে বলে দেখা গেছে।
চুলের রঙের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ৪ ‘ভিলেন’
১. পিপিডি (PPD): এটি পার্মানেন্ট ডাইয়ে থাকে যা ডিএনএ-র ক্ষতি করতে পারে এবং মারাত্মক অ্যালার্জি সৃষ্টি করে।
২. অ্যামোনিয়া: এটি চুলের কিউটিকল খুলে রং ঢোকায়। এর গন্ধে ফুসফুসের ক্ষতি এবং চোখ জ্বালা করার সমস্যা হতে পারে।
৩. রিসোর্সিনল: এটি শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে থাইরয়েডের সমস্যা ডেকে আনে।
৪. কোল টার: কিছু ডাইয়ে এটি থাকে, যা সরাসরি ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে বলে গবেষণায় প্রমাণিত।
যাঁদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি
যাঁরা পার্লারে দীর্ঘক্ষণ কাজ করেন কিংবা মাসে একাধিকবার চুলে গাঢ় রং লাগান, তাঁদের বিপদ বেশি। এছাড়া ১৬ বছরের কম বয়স থেকে রং শুরু করা এবং ঘরে বসে অপর্যাপ্ত ভেন্টিলেশনে গ্লাভস ছাড়া রং মাখা ঝুঁকির মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
সুরক্ষিত থাকার ৭টি গোল্ডেন রুল
১. সঠিক ডাই বাছুন: সবসময় PPD ও অ্যামোনিয়া ফ্রি কালার কিনুন। ইন্ডিগো বা হেনা বেসড অর্গানিক কালার বেছে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।
২. প্যাচ টেস্ট: রং ব্যবহারের ৪৮ ঘণ্টা আগে কানের পিছনে বা কনুইয়ে লাগিয়ে পরীক্ষা করুন।
৩. স্ক্যাল্প বাঁচান: গোড়া থেকে ১ ইঞ্চি ছেড়ে রং লাগান, যাতে রাসায়নিক রক্তে মিশতে না পারে।
৪. সময়সীমা: প্যাকেটে লেখা সময়ের বেশি রং চুলে রাখবেন না।
৫. সুরক্ষা: নিজে রং করলে গ্লাভস ও মাস্ক ব্যবহার করুন এবং ঘর খোলা রাখুন।
৬. বিরতি দিন: বছরে ৫-৬ বারের বেশি রং করবেন না। অন্তত ৬-৮ সপ্তাহ গ্যাপ দিন।
৭. সেমি-পার্মানেন্ট: এগুলো চুলের গভীরে ঢোকে না, তাই ঝুঁকিও কম।
প্রাকৃতিক উপায়ে চুল রাঙাতে মেহেন্দি, ইন্ডিগো, কফি বা বিটের রস ব্যবহার করতে পারেন। মনে রাখবেন, ফ্যাশনের চেয়ে জীবন বেশি দামী। অমিতাভ বচ্চন বা জর্জ ক্লুনির মতো সেলিব্রিটিরাও এখন ‘গ্রে হেয়ার’ বা পাকা চুলে ফ্যাশন করছেন। তাই সুস্থ থেকে স্মার্ট থাকাই হোক আপনার আসল লক্ষ্য।





