পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন নাটকীয় মোড় আগে কখনও দেখা যায়নি। দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে ২০৭টি আসন জিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা হাসিল করেছে বিজেপি। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই শুরু হয়েছে এক নজিরবিহীন সাংবিধানিক অচলাবস্থা। হারের ধাক্কায় যখন তৃণমূল শিবিরের কর্মী-সমর্থকরা দিশেহারা, ঠিক তখনই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক জেদি ঘোষণা রাজ্য রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক উস্কে দিয়েছে। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, হার স্বীকার করবেন না এবং মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফাও দেবেন না।
সোমবার ফলাফল ঘোষণার পর দেখা যায়, বিরোধী দল বিজেপি ১৪৮-এর জাদুর সংখ্যা পার করে ২০৭টি আসনে জয়ী হয়েছে। সেখানে শাসকদল তৃণমূল মাত্র ৮০টি আসনে থমকে গিয়েছে। এই বিপর্যয় সত্ত্বেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ‘গণতন্ত্র লুণ্ঠনের’ অভিযোগ তুলেছেন। মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি দাবি করেন, “আমি ইস্তফা দেব না। আমি হারিনি। রাজভবনে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। প্রশাসনিকভাবে ওরা আমাদের হারাতে পারে, কিন্তু নৈতিকভাবে আমরাই জয়ী।”
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অনড় অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছেন দক্ষিণী ফিল্মমেকার রাম গোপাল ভার্মা (RGV)। নিজের বেপরোয়া মন্তব্যের জন্য পরিচিত আরজিভি এক্স হ্যান্ডেলে (টুইটার) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করে লেখেন, “রাজনীতিতে এত দশকের অভিজ্ঞতা এবং ১৫ বছর মুখ্যমন্ত্রী থাকার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী করে ভুলে গেলেন যে গণতন্ত্রের মূল ডিএনএ হল বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানের ওপর আক্রমণ করা মানে খোদ গণতন্ত্রকে অপমান করা।”
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলে দাবি করেছেন যে, ভোট গণনার সময় তাঁর প্রতিনিধিদের মারধর করা হয়েছে এবং সিসিটিভি ক্যামেরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি তাঁর গায়ে হাত তোলা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। কান্নায় ভেঙে না পড়ে বরং জেদি মেজাজে তিনি বলেন, “আমার পেটে লাথি মারা হয়েছে। আমি এখন একজন মুক্ত বিহঙ্গ। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কোনো পেনশন বা বেতন আমি গত ১৫ বছরে নিইনি। এখন আমি সাধারণ নাগরিক হিসেবে ‘ইন্ডিয়া’ জোটকে আরও শক্তিশালী করব।”
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদী পশ্চিমবঙ্গের এই জয়কে ঐতিহাসিক বলে অভিহিত করেছেন এবং বাংলার মানুষকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। বিজেপির এই বিপুল জয়ের পর যখন রাজ্যে উৎসবের আবহাওয়া, তখন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর ইস্তফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাকে এক গভীর আইনি ও সাংবিধানিক জটিলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রাজ্যপাল এই পরিস্থিতিতে কী পদক্ষেপ নেন, এখন সেটাই দেখার।





