৮ বছরের সম্পর্কে জল্পনা তুঙ্গে! ট্রাম্পের গোপন যাত্রার সঙ্গী এই তরুণী কে?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে গত কয়েক বছর ধরে যাঁদের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন ৩৫ বছর বয়সি নাটালি হার্প। হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্টের এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই তরুণী বর্তমানে মার্কিন রাজনীতিতে এক অত্যন্ত প্রভাবশালী চরিত্র হয়ে উঠেছেন। ট্রাম্পের সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট টাইপ করা থেকে শুরু করে ওভাল অফিসের গোপন বৈঠক এবং দেশ-বিদেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সফরে তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি মার্কিন সংবাদমাধ্যমে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের সিনেটর জন অসফের একটি মন্তব্যের জেরে নাটালি হার্পকে নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে শোরগোল শুরু হয়েছে। সিনেটর অসফ ট্রাম্প এবং তাঁর এই তরুণী সহকারীকে নিয়ে এক রসাত্মক মন্তব্য করেন। তাঁর দাবি, ৮০ বছর বয়সি মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর এই ৩৫ বছর বয়সি সহকারীর সঙ্গে এমন একটি বিশেষ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন, যা প্রশাসনিক কাজের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। অসফ অভিযোগ করেন যে, ট্রাম্প নিজের দাপ্তরিক দায়িত্বের চেয়ে বিলাসবহুল বলরুম তৈরি এবং কাতার আমিরের দেওয়া নতুন ‘ফ্লাইং প্যালেস’ অর্থাৎ এয়ারফোর্স ওয়ানে নাটালিকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেই বেশি আগ্রহী। এই মন্তব্যের পর হোয়াইট হাউজ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানালে হার্পের ভূমিকা আরও জোরালোভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।
ক্যালিফোর্নিয়ার একটি রক্ষণশীল খ্রিস্টান পরিবারে বেড়ে ওঠা নাটালি হার্পের হোয়াইট হাউসে পৌঁছানোর পথটি একেবারে প্রচলিত ধারার ছিল না। ট্রাম্পের প্রথম শাসনকালে তিনি নিজের ক্যানসার চিকিৎসার অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে এনে প্রথম জাতীয় স্তরে আলোচনায় আসেন। ট্রাম্পের সমর্থিত ‘রাইট টু ট্রাই’ আইনের সুবাদেই তিনি পরীক্ষামূলক চিকিৎসার মাধ্যমে নতুন জীবন ফিরে পেয়েছিলেন বলে দাবি করেন হার্প। ২০২০ সালের রিপাবলিকান ন্যাশনাল কনভেনশনে এই বিষয়ে বক্তব্য রেখে তিনি সরাসরি ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। এর পর থেকেই ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ বা ‘মাগা’ আন্দোলনের কট্টর সমর্থকদের মধ্যে তাঁর পরিচিতি দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং ২০২০ সালের নির্বাচনী প্রচারে তিনি ট্রাম্পের উপদেষ্টা বোর্ডে জায়গা করে নেন। ট্রাম্পের সেই পরাজয়ের পর হার্প রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যম ওয়ান আমেরিকা নিউজ নেটওয়ার্কে অনুষ্ঠান উপস্থাপনার দায়িত্ব নেন, যেখানে তিনি ট্রাম্পের অন্ধ ভক্ত ও ঘনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। অবশেষে ২০২২ সালে তিনি সরাসরি ট্রাম্পের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারে যোগ দেন।
হোয়াইট হাউসে নাটালি হার্পের দাপ্তরিক পদ প্রেসিডেন্টের এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট হলেও তাঁর আসল কাজের পরিধি প্রথাগত পদের গণ্ডি বহু আগেই ছাড়িয়ে গেছে। হোয়াইট হাউসের অন্দরে সাংবাদিকেরা প্রায়শই তাঁকে ট্রাম্পের ছায়াসঙ্গী হিসেবে দেখতে পান। ট্রাম্প কোন সংবাদ বা সোশ্যাল মিডিয়া আপডেট সবার আগে দেখবেন, সেই বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রেও তাঁর বড় ভূমিকা রয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। এই বিশেষ ক্ষমতার জন্যই অনেকে তাঁকে হোয়াইট হাউসের ‘গেটকিপার’ বলে অভিহিত করেন। হার্পকে প্রায়শই একটি বহনযোগ্য প্রিন্টার হাতে ট্রাম্পের চারপাশে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়, যার কারণে মার্কিন মিডিয়া তাঁকে ভালোবেসে বা কটাক্ষ করে ‘হিউম্যান প্রিন্টার’ বলে ডাকে। ট্রাম্প মুদ্রিত কাগজে বিভিন্ন তথ্য পড়তে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন, আর সেই কারণেই হার্পের এই ভূমিকা ওভাল অফিসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের অফিশিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট তথা ট্রুথ সোশ্যালের পোস্ট তৈরিতেও হার্পের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রমাণ মিলেছে। ২০২৪ সালের একটি ভিডিওতে দেখা গিয়েছিল, ট্রাম্প যখন কোনো বক্তৃতা দেখছেন, তখন হার্প তাঁর পাশেই বসে ঠিক ট্রাম্পের নিজস্ব ভাষা ও রাজনৈতিক ভঙ্গিতে একটি পোস্ট টাইপ করছেন। ট্রাম্পের বার্তা ও বয়ান তৈরিতে তাঁর এই নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ হোয়াইট হাউসের অন্দরে তাঁর অসামান্য প্রভাবের কথাই স্পষ্ট করে। এছাড়া সম্প্রতি তুরস্ক থেকে ট্রাম্পের গোপন বিমান পরিবর্তনের নাটকীয় ঘটনার নেপথ্যেও হার্পের উপস্থিতি নিয়ে নানা তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। গোয়েন্দা সূত্রে সম্ভাব্য ইরানি হামলার হুমকির তথ্য পাওয়ার পর ট্রাম্প যখন অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে বিমান পরিবর্তন করেন, তখন তাঁর সঙ্গে থাকা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত দলটির অংশ ছিলেন নাটালি হার্প।
এই সমস্ত ঘটনার জেরে নাটালি হার্পের ক্ষমতা ও ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও হোয়াইট হাউজ দৃঢ়ভাবে তাঁর পাশেই দাঁড়িয়েছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্ররা তাঁকে ট্রাম্পের প্রশাসনের একজন অত্যন্ত ‘বিশ্বস্ত ও মূল্যবান’ সদস্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নাটালি হার্পের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য জনসমক্ষে না এলেও তাঁর ভাই প্রেস্টন হার্প এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, ছোটবেলা থেকেই তাঁর বোন হোয়াইট হাউজে কাজ করার জন্য প্রবলভাবে আগ্রহী ছিলেন এবং অতীতে একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্টকে চিঠিও লিখেছিলেন। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হোয়াইট হাউসের ক্ষমতার অলিন্দে নাটালি হার্পের এই উত্থান মার্কিন রাজনীতির এক অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হয়ে উঠেছে।