৩০ বছর পর শালবনে মরণফাঁদ! ৪টি রাজ্যের বনভূমি ধ্বংস করতে আসা পোকার মোকাবিলায় ‘অপারেশন ট্র্যাপ ট্রি’

মধ্যপ্রদেশের দিন্ডোরি জেলার ঘন শাল বন আবারও এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক সংকটের মুখোমুখি। প্রায় ৩০ বছর পর বনভূমিতে ফিরে এসেছে ‘শাল বোরার’ (Sal Borer) নামক এক বিধ্বংসী পোকার উপদ্রব। শেষবার ১৯৯৫ সালে এই পোকার আক্রমণে বনভূমি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। চলতি ২০২৬-২৭ মরসুমে ফের একবার শালগাছের প্রাণনাশে মেতে উঠেছে এই পতঙ্গ। বন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই ৩০,৪৮৭ হেক্টর বনভূমি আক্রান্ত হয়েছে এবং প্রায় ১,৪৬,৭৮৪টি শালগাছে সংক্রমণের অস্তিত্ব মিলেছে।
দিন্ডোরি জেলায় প্রায় দেড় লক্ষ হেক্টর এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে প্রায় ৪০ কোটি শালগাছ। শাল বোরার বা বিজ্ঞানসম্মতভাবে ‘হপলোসিরেনবিক্স স্পাইনিকর্নিস’ (Hoplocerambyx spinicornis) প্রজাতির এই বিটল পোকা গাছের ছালের নিচে ডিম পাড়ে। ডিম থেকে বের হওয়া লার্ভা গাছের কাণ্ডের ভেতর সুড়ঙ্গ তৈরি করে কাঠ খেতে শুরু করে। এর ফলে গাছ ভেতর থেকে পচে শুকিয়ে যায় এবং অকালে প্রাণ হারায়। শাল বনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুসংস্থানের জন্য এটি একটি বড় বিপর্যয়।
এই সংকট নিরসনে বন দপ্তর জবলপুরের বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের (FRI) প্রযুক্তিগত সহায়তায় ‘অপারেশন ট্র্যাপ ট্রি’ (Operation Trap Tree) নামক এক অভিনব কৌশল গ্রহণ করেছে। এই পদ্ধতিতে প্রতি দুই হেক্টর জমিতে একটি নির্দিষ্ট শালগাছকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। গাছটির ছাল এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয় যাতে একটি বিশেষ গন্ধ নির্গত হয়, যা হাজার হাজার শাল বোরার পোকাকে আকর্ষণ করে। সেখানে জড়ো হওয়া পোকাদের সহজেই ধ্বংস করা সম্ভব হচ্ছে।
এই যুদ্ধে বন দপ্তরের পাশাপাশি স্থানীয় গ্রামবাসীরাও অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে ৭টা পর্যন্ত গ্রামবাসীরা জঙ্গলে গিয়ে এই ক্ষতিকারক পোকা ধরছেন। বন দপ্তর প্রতিটি পোকা ধরার বিনিময়ে গ্রামবাসীদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি ২ টাকা করে পুরস্কার পাঠাচ্ছে। এই প্রকল্পের সুফল মিলছে—ইতিমধ্যেই প্রায় ১০ লক্ষাধিক পোকা ধরা পড়েছে। ডিএফও ভারতী ঠাকরে জানিয়েছেন, গুরুতরভাবে আক্রান্ত প্রায় ১.৪৬ লক্ষ গাছ কাটার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অনুমতি চাওয়া হয়েছে। অনুমতি পাওয়া গেলে তিন মাসের মধ্যে সেই গাছগুলো অপসারণ করে সংক্রমণের বিস্তার রোধ করা হবে।
শালবন কেবল পরিবেশের ভারসাম্যই রক্ষা করে না, এটি লক্ষ লক্ষ বনবাসীর জীবন-জীবিকার মূল উৎস। তাই এই লড়াইটি কেবল গাছ বাঁচানোর নয়, বরং এক বিশাল বাস্তুসংস্থান ও অর্থনীতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। বন দপ্তরের এই পরিকল্পিত অভিযান এবং গ্রামবাসীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ যদি সফল হয়, তবেই দিন্ডোরির এই অমূল্য বনসম্পদকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।