ভারতের বিরুদ্ধে ফের জল-সন্ত্রাসের অভিযোগ পাকিস্তানের! করাচি থেকে পাঞ্জাব—তীব্র জলকষ্টে দিশেহারা ২৪ কোটি মানুষ

তীব্র দাবদাহে মে ও জুন মাসে পাকিস্তানজুড়ে যে নজিরবিহীন জলসংকট তৈরি হয়েছিল, তা এখন ২৪ কোটি মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সিন্ধু নদ ও তার প্রধান উপনদীগুলোতে জলের স্তর আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় করাচিসহ দেশটির একাধিক প্রধান শহর এখন চরম সংকটের মুখে। সরকারি তথ্যানুযায়ী, চেনাব নদী থেকে পাকিস্তান আগে দৈনিক যে ২১,৮৮৭ কিউসেক জল পেত, বর্তমানে তা কমে মাত্র ৫,৬৮৯ কিউসেক-এ নেমে এসেছে। সিন্ধু ও অন্যান্য নদীর ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একই রকম উদ্বেগজনক।

গ্রীষ্মকালের ভয়াবহ জলকষ্ট কাটতে না কাটতেই পাকিস্তানে বর্ষা প্রবেশ করেছে। আর এর ফলে এখন নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ডন পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর বন্যায় পাঞ্জাব প্রদেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একাধিক ঘাঁটি ডুবে গিয়েছিল এবং দেশজুড়ে ১,০০০-এরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সেই স্মৃতি ফের তাজা হওয়ায় পাকিস্তান সরকার এবার বন্যা মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা অবলম্বন করছে। সিন্ধু ও অন্যান্য নদীর নাব্যতা বাড়াতে এবং পলি অপসারণের লক্ষ্যে বুলডোজার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। এছাড়াও নদী তীরবর্তী অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করার প্রক্রিয়াও শুরু করা হয়েছে।

পাকিস্তান সরকারের অভিযোগ, ভারত সিন্ধু জল চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নিয়মিতভাবে জলের প্রবাহ বা তথ্য আদান-প্রদান করছে না। ইসলামাবাদের দাবি, ভারত থেকে ঠিক কত পরিমাণ জল আসবে, তা নিয়ে কোনো পূর্বাভাস না থাকায় পাকিস্তান প্রতি মুহূর্তে আতঙ্কে থাকছে। পাকিস্তানের সেচ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, গত বছরের মতো এবারও বর্ষাকালে ভারত হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ জল ছেড়ে দিতে পারে, যা দেশটিতে ভয়াবহ বন্যার জন্ম দেবে। ভারতের অঘোষিত পদক্ষেপের ফলে বাঁধের জলস্তর নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে বলে মনে করছে পাকিস্তান প্রশাসন।

এই জলসংকট কেবল বন্যার আশঙ্কায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং জল বন্টন নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইও অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলে জল সংক্রান্ত বিবাদ নিরসনের জন্য পাকিস্তান ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ICJ) দ্বারস্থ হয়েছে। এই মামলা লড়ার জন্য পাকিস্তান ভারতের ভাগের খরচও বহন করছে, যা আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের কাছে এক বিস্ময়কর ঘটনা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই আইনি লড়াইয়ে পাকিস্তান এখন পর্যন্ত ৫৭.৭ মিলিয়ন রুপি ব্যয় করেছে।

বর্তমানে পাকিস্তান সেচ বিভাগ ও সেনাবাহিনী যৌথভাবে নদীগুলো খনন এবং দখলমুক্ত করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে বন্যার প্রভাব যতটা সম্ভব প্রশমিত করা যায়। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু খননকার্য বা নদী দখলমুক্ত করলেই পাকিস্তান এই মহাবিপদ থেকে রক্ষা পাবে না। বরং সিন্ধু জল চুক্তির আধুনিকায়ন এবং ভারতের সঙ্গে স্বচ্ছ তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদী সমাধান সম্ভব। আপাতত বর্ষার অমোঘ হাত থেকে বাঁচতে এবং জল-সঙ্কট ও বন্যা—এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে পাকিস্তান।