সূর্যের তাপে গরম থাকে ঘর, জলের বদলে বর্জ্যই সার! লাদাখের সোনম ওয়াংচুকের বাড়িটি কেন বিস্ময়?

লাদাখের কনকনে শীতের কথা ভাবলেই আমাদের মনে পড়ে হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রার কথা। কিন্তু সেই পাহাড়েও যদি এমন একটি বাড়ি থাকে, যেখানে কোনো কৃত্রিম জ্বালানি বা উনুন ছাড়াই ঘর থাকে উষ্ণ, তবে তা নিশ্চিতভাবেই বিস্ময়। প্রখ্যাত জলবায়ু কর্মী, ইঞ্জিনিয়ার এবং শিক্ষাসংস্কারক সোনম ওয়াংচুকের বাসগৃহ ঠিক তেমনই এক অনন্য স্থাপত্য। বছর তিনেক আগে ‘ট্রাইবাল গার্ল’ খ্যাত অমিতা ছোরগিয়া নেগির ইউটিউব চ্যানেলে যখন এই বাড়ির ঝলক প্রথমবার প্রকাশ্যে আসে, তখন থেকেই দেশজুড়ে আগ্রহের তুঙ্গে এই পরিবেশবান্ধব অট্টালিকা।

সোনম ওয়াংচুকের এই অভিনব বাড়িটি লাদাখের ‘সেকমল’ (SECMOL) ক্যাম্পাসের ভেতরে অবস্থিত। হাজার বছরের পুরনো পাহাড়ি স্থাপত্যশৈলী আর আধুনিক বিজ্ঞানের মেলবন্ধনে তৈরি এই বাড়িটি বাস্তুবিদ্যার এক নতুন দৃষ্টান্ত। বাড়ির দেওয়াল তৈরি হয়েছে কাদা-মাটি দিয়ে, যা লাদাখ, কিন্নর ও তিব্বতের প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক। মাটির দেওয়াল হওয়ার কারণে গ্রীষ্মকালে এই বাড়ি থাকে স্বাভাবিকভাবেই শীতল, আবার শীতের তীব্র প্রকোপ থেকেও দেয়ালগুলো রক্ষা করে ভেতরের বাসিন্দাদের।

এই বাড়ির সবচেয়ে বড় চমক এর ‘সোলার প্যাসিভ’ প্রযুক্তি। শীতের রাতে ঘর গরম রাখার জন্য ওয়াংচুক কোনো ‘বুখারি’ বা কয়লার উনুন জ্বালান না। এর বদলে বাড়ির বাইরের দিকে বড় কাচের জানলার পেছনে একটি কালো রঙের দেওয়াল তৈরি করা হয়েছে, যা আসলে জলভর্তি প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে গড়া। দিনের বেলা এই বোতলগুলো সূর্যের তাপ শোষণ করে এবং রাতে সেই তাপ ধীরে ধীরে ছেড়ে ঘরকে ১৮ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উষ্ণ রাখে। এটিই এই বাড়ির প্রাকৃতিক হিটিং সিস্টেম।

বাড়ির বাইরেটা প্রাচীন মনে হলেও, ভেতরটা পুরোদস্তুর আধুনিক। ঘরের ভেতর রয়েছে রুচিশীল আসবাবপত্র, আরামদায়ক সোফা, মডুলার কিচেন এবং আধুনিক বাথরুম। তবে বাথরুম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ওয়াংচুক পরিবেশ রক্ষার নীতি মেনে চলেন। সাধারণ আধুনিক বাথরুমে ফ্লাশ করলে দিনে ৫ থেকে ১০ লিটার জল নষ্ট হয়, কিন্তু এখানে এমন এক বিশেষ শৌচাগার রয়েছে যেখানে জলের বদলে কাঠের গুঁড়ো বা মাটি ব্যবহার করা হয়। এর ফলে কোনো দুর্গন্ধ হয় না এবং মানব বর্জ্য সরাসরি জৈব সারে রূপান্তরিত হয়, যা পরে কৃষি কাজে ব্যবহার করা হয়।

বাড়ির নকশা এমনভাবে করা হয়েছে যাতে আলো-বাতাসের পর্যাপ্ত চলাচল বজায় থাকে। রান্নাঘরটি তৈরি করা হয়েছে যৌথ পরিবারের কথা মাথায় রেখে, যেখানে সবাই মিলে রান্না ও আড্ডায় সময় কাটাতে পারেন। এ ছাড়া বাড়ির আঙিনায় রয়েছে একটি গ্রিনহাউস ও আপেল বাগান। সোনম ওয়াংচুকের এই বাড়ি শুধুমাত্র একটি থাকার জায়গা নয়, এটি পরিবেশের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে বেঁচে থাকার এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।