“লিভ-ইন সম্পর্কেও প্রযোজ্য হবে এই আইন….?”-স্পষ্ট জানিয়ে দিলো সুপ্রিমকোর্ট

নারীর অধিকার ও পরিবর্তনশীল সামাজিক সম্পর্কের বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিয়ে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, বিবাহের মতো ‘লিভ-ইন’ (Live-in) সম্পর্কে থাকা কোনো নারীর প্রতি নিষ্ঠুরতা বা নির্যাতন ঘটলে, তা ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) ৪৯৮এ ধারার অধীনে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। শুধুমাত্র সম্পর্কটি আনুষ্ঠানিক বিবাহ নয়—এই যুক্তিতে কোনো নারীকে আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না বলেই সাফ জানিয়েছে আদালত।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মূল বক্তব্য

বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি এন. কোটিশ্বর সিং-এর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ তাঁদের রায়ে স্পষ্ট করেছেন যে, ৪৯৮এ ধারার মূল লক্ষ্য হলো নারীদের গার্হস্থ্য নিষ্ঠুরতা ও হয়রানি থেকে রক্ষা করা। সমাজের পরিবর্তনশীল সম্পর্ক এবং বর্তমান সামাজিক বাস্তবতার আলোকে এই আইনের ব্যাখ্যা হওয়া উচিত।

আদালত উল্লেখ করেছে, কিছু লিভ-ইন সম্পর্ক কার্যত বিবাহের সমতুল্য প্রকৃতির হয়। এই ধরনের ক্ষেত্রে যদি কোনো নারী নিষ্ঠুরতা বা হয়রানির শিকার হন, তবে তাঁকে বৈধ বিবাহে বসবাসকারী একজন নারীর মতোই সমান আইনি সুরক্ষা দেওয়া বাধ্যতামূলক।

সব লিভ-ইন সম্পর্ক এই আইনের আওতাভুক্ত নয়

তবে শীর্ষ আদালত এও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, প্রতিটি লিভ-ইন সম্পর্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৪৯৮এ ধারার আওতায় আসবে না। এই সুবিধা পেতে হলে সংশ্লিষ্ট মহিলাকে প্রমাণ করতে হবে যে:

  • উভয় পক্ষই একে অপরকে বিয়ে করতে ইচ্ছুক ছিলেন।

  • তাঁদের সম্পর্কটি ছিল প্রকৃত অর্থেই ‘বিবাহ-সদৃশ প্রকৃতির’।

শুধুমাত্র একসঙ্গে বসবাস করা মানেই তা ৪৯৮এ ধারার অধীনে সুরক্ষিত সম্পর্ক হিসেবে গণ্য হবে না। প্রতিটি মামলার সুনির্দিষ্ট ঘটনা ও পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কর্নাটক হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্টে মামলা

মূলত কর্ণাটক হাইকোর্টের একটি রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলের ভিত্তিতে এই মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছয়। ওই মামলায় এক মহিলা অভিযোগ করেছিলেন যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি তাঁর প্রথম বিয়ের কথা গোপন করে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে তাঁকে যৌতুকের জন্য হয়রানি, নিষ্ঠুরতা ও এমনকী হত্যাচেষ্টার শিকার হতে হয়।

অন্যদিকে, অভিযুক্তের যুক্তি ছিল যে, তাঁদের দ্বিতীয় বিয়ে বা সম্পর্কটি আইনত বৈধ ছিল না, তাই তাঁকে ‘স্বামী’ হিসেবে গণ্য করা যায় না এবং তাঁর ক্ষেত্রে ৪৯৮এ ধারা প্রযোজ্য হতে পারে না। তবে অভিযুক্তের এই যুক্তি সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালত জানিয়েছে, এই ধরনের প্রযুক্তিগত বা আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে নারীদের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা যায় না, যা সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত সমতার নীতির পরিপন্থী।

আইনের পরিধি ও গ্রেফতার সংক্রান্ত নির্দেশিকা

  • গার্হস্থ্য হিংসা আইন বনাম ৪৯৮এ: সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, ‘নারীদের গার্হস্থ্য হিংসা থেকে সুরক্ষা আইন, ২০০৫’-এ ইতিমধ্যেই লিভ-ইন সম্পর্ককে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা মূলত দেওয়ানি প্রতিকার প্রদান করে। অন্যদিকে, আইপিসি-র ৪৯৮এ ধারা অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কড়া ফৌজদারি দায়বদ্ধতা ও ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ দেয়।

  • গ্রেফতারের ক্ষেত্রে সতর্কতা: এই ধরনের মামলায় পুলিশকে অবশ্যই ‘অর্নেশ কুমার বনাম বিহার রাজ্য’ মামলার সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা মেনে চলতে হবে। প্রাথমিক তদন্ত ও পর্যাপ্ত কারণ ছাড়া শুধুমাত্র অভিযোগের ভিত্তিতে অবিলম্বে গ্রেফতার এড়াতে বলা হয়েছে, যাতে আইনের কোনো অপব্যবহার না হয়।

সব পক্ষের বিস্তারিত সওয়াল-জবাব শোনার পর সুপ্রিম কোর্ট অভিযুক্তের আপিল খারিজ করে দেয় এবং সাফ জানিয়ে দেয় যে, বর্তমান মামলাটিতে ফৌজদারি কার্যক্রম বাতিল করার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।