মধ্যমগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর দীর্ঘদিনের ছায়াসঙ্গী চন্দ্রনাথ রথের নৃশংস হত্যাকাণ্ড কেবল একটি রাজনৈতিক খুন নয়, বরং এটি ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের এক রক্তাক্ত ইতিহাসকে নতুন করে উসকে দিল। যেভাবে প্রকাশ্য রাস্তায় চন্দ্রনাথকে গুলি করে ঝাঁঝরা করা হয়েছে, তার সঙ্গে ২০২০ সালের টিটাগড়ে বিজেপি নেতা মণীশ শুক্লা খুনের ঘটনার হুবহু মিল খুঁজে পাচ্ছেন তদন্তকারী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
মণীশ শুক্লা হত্যাকাণ্ড: যখন স্তব্ধ হয়েছিল বিটি রোড ২০২০ সালের ৪ অক্টোবর, রবিবার সন্ধেবেলা। টিটাগড় থানার ঢিলছোড়া দূরত্বে বিটি রোডের ওপর ঠিক একইভাবে চারজন বাইক আরোহী দুষ্কৃতী ঘিরে ধরেছিল অর্জুন সিংয়ের ‘ডান হাত’ হিসেবে পরিচিত মণীশ শুক্লাকে। খুব কাছ থেকে একের পর এক গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছিল তৎকালীন এই জনপ্রিয় কাউন্সিলরকে। চন্দ্রনাথের মতোই মণীশও ছিলেন নেতার অত্যন্ত আস্থাভাজন এবং প্রভাবশালী।
সেই একই ব্লুপ্রিন্ট ও শার্প শ্যুটার রহস্য মণীশ শুক্লা খুনের তদন্তে সিআইডি (CID) নাসির আলি মণ্ডল-সহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছিল। তদন্তে উঠে এসেছিল যে, খুনের পর নাসির বাংলাদেশে পালিয়ে গিয়েছিল। ঠিক একইভাবে, চন্দ্রনাথের খুনিরাও বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে পালিয়েছে বলে দাবি করছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। দু’টি ঘটনার ক্ষেত্রেই অভিযোগের তির ‘পেশাদার শার্প শ্যুটার’-দের দিকে। মণীশ খুনেও যেমন ব্যক্তিগত শত্রুতাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, চন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও সেই একই ছক কাজ করছে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না।
রাজনীতির চেনা ছক ও ‘মূল চক্রী’ বিতর্ক মণীশ শুক্লা খুনের পর অর্জুন সিং সরাসরি তৎকালীন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষ ও শীলভদ্র দত্তকে অভিযুক্ত করেছিলেন। যদিও খুররম খান ও গুলাব শেখের মতো দুষ্কৃতীরা ধরা পড়েছিল, কিন্তু এই খুনের নেপথ্যে থাকা ‘আসল মাস্টারমাইন্ড’ কারা, তা আজও ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের মানুষের কাছে এক অমীমাংসিত প্রশ্ন। চন্দ্রনাথ খুনেও এখন ঠিক একইভাবে শাসকদলের শীর্ষ নেতাদের দিকে আঙুল তুলছে গেরুয়া শিবির।
ব্যারাকপুর থেকে মধ্যমগ্রাম: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি? কে ছিলেন মণীশ শুক্লা? খড়দহের এই লড়াকু ছাত্রনেতা একসময় সিপিএম ও তৃণমূল ঘুরে অর্জুন সিংয়ের হাত ধরে বিজেপির অন্যতম স্তম্ভ হয়ে উঠেছিলেন। ঠিক যেমন চণ্ডীপুরের চন্দ্রনাথ বায়ুসেনার চাকরি ছেড়ে ২০১৯ সাল থেকে শুভেন্দুর বিশ্বস্ত সেনাপতি হয়ে উঠেছিলেন।
তদন্তকারীরা দেখছেন, দুই নেতার খুনের ধরনেই রয়েছে চরম পেশাদারিত্ব। বাইকে এসে দ্রুত অপারেশন শেষ করে পালিয়ে যাওয়া, অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার এবং নিশানাকে কোনো সুযোগ না দেওয়া— এই তিন মিলই বলছে যে, চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ডের নকশা হয়তো অনেক আগে থেকেই তৈরি ছিল, যা মণীশ শুক্লা হত্যাকাণ্ডের সেই বীভৎস স্মৃতিকেই ফিরিয়ে আনল।





