রাজনীতির লড়াই কেবল ভোটবাক্সে সীমাবদ্ধ থাকে না, কখনও কখনও তা ব্যক্তিগত জেদ আর ত্যাগের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার হাসনাবাদের আমলানি পঞ্চায়েতে ঠিক তেমনই এক বিরল ঘটনার সাক্ষী থাকল মানুষ। দীর্ঘ পাঁচ বছরের ‘কেশ-সন্ন্যাস’ ভঙ্গ করলেন সিপিএমের প্রাক্তন পঞ্চায়েত সদস্য জামশেদ সরদার। রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের পতন নিশ্চিত—এই বিশ্বাস থেকে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে, মিষ্টি মুখ করিয়ে নিজের দীর্ঘদিনের লালিত চুল কেটে ফেললেন এই বাম নেতা।
ঘটনাটি ঘটেছে হাসনাবাদের হরিপুর হাটখোলায়। এদিন জামশেদ সরদারের চুল কাটার অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এলাকায় রীতিমতো উৎসবের মেজাজ তৈরি হয়। বাদ্যযন্ত্রের তালে নেচে-গেয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করা হয়। কিন্তু এই উৎসবের নেপথ্যে লুকিয়ে ছিল এক যন্ত্রণাদায়ক রাজনৈতিক ইতিহাস। জামশেদ সরদারের দাবি অনুযায়ী, এই প্রতিজ্ঞার মূলে ছিল ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরবর্তী ভয়াবহ হিংসা।
স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন জামশেদ। তিনি জানান, ২০২১ সালে আমলানি পঞ্চায়েতের প্রাক্তন এই সদস্য বাম প্রার্থীর হয়ে নির্বাচনী এজেন্টের দায়িত্ব সামলেছিলেন। অভিযোগ, ফল প্রকাশের পর তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীরা তাঁর ওপর অকথ্য শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার চালায়। জামশেদ বলেন, “সেই সময় প্রায় ১০০-১৫০ জন লোক রাত এগারোটার সময় আমার বাড়িতে আক্রমণ চালিয়েছিল। আমি ভাত নিয়ে খেতে বসেছিলাম, সেই ভাতটুকুও আমাকে খেতে দেয়নি ওরা। আমায় প্রচণ্ড অপমান করা হয়েছিল।”
সেই চরম লাঞ্ছনার জ্বালা থেকেই তিনি কঠিন শপথ নিয়েছিলেন—যতদিন না রাজ্যে সরকারের পরিবর্তন ঘটবে, ততদিন তিনি চুলে কাঁচি ছোঁয়াবেন না। গত পাঁচ বছর ধরে সেই দীর্ঘ চুল তাঁর প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল। অবশেষে রাজ্যে রাজনৈতিক পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে বলে বিশ্বাস করে, তিনি নাপিত ডেকে প্রথাগতভাবে চুল কাটার সিদ্ধান্ত নেন।
একজন রাজনৈতিক কর্মীর এমন ব্যক্তিগত ও দীর্ঘমেয়াদী প্রতিবাদ দেখে তাজ্জব হয়ে গিয়েছে রাজনৈতিক মহল। জামশেদ সরদার এদিন বলেন, “আজ দীর্ঘ পাঁচ বছর পর আমার সেই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করতে পেরে খুব ভালো লাগছে। আমি আশাবাদী যে মানুষ আবারও সিপিএম-কে উন্নয়নের মঞ্চে ফিরিয়ে আনবে।” সাধারণ মানুষের ভিড় আর এই উৎসবের আবহ এখন জেলার অন্যতম আলোচিত বিষয়।





