বর্ধমানের কৃষ্ণসায়র পার্কের অজানা ইতিহাস, যে সায়রের পাড়ে খুন হয়েছিলেন জমিদার জগৎ রাম রায়

বর্ধমানের কৃষ্ণসায়র, যা বর্তমানে একটি মনোরম পার্কের কেন্দ্রে অবস্থিত। এই সায়রটি শুধু প্রজাদের জলকষ্ট দূর করার জন্য খনন করা হয়নি, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বর্ধমানের রাজ পরিবারের এক রোমহর্ষক ও রক্তাক্ত ইতিহাস। এই সায়রের পাড়েই ছুরির আঘাতে খুন হয়েছিলেন বর্ধমানের তৎকালীন জমিদার জগত রাম রায়।
কৃষ্ণসায়র খননের প্রেক্ষাপট
বর্ধমান রাজ পরিবার প্রথমে ছিল এক ব্যবসায়ী পরিবার। ধীরে ধীরে তারা জমিদারি লাভ করে এবং পরে মুঘলদের কাছ থেকে রাজা উপাধি পায়।
খননকারী: কৃষ্ণসায়র খনন করেন জমিদার কৃষ্ণ রাম রায়। রাজ উপাধি লাভ করার আগে, ১৬৬৫ সাল থেকে তিনি বর্ধমানের জমিদারি সামলাচ্ছিলেন।
উদ্দেশ্য: মূলত গোলাপবাগ ও আশেপাশের এলাকার অল্প সংখ্যক মানুষের জলকষ্ট দূর করার জন্য এই সায়রটি খনন করা হয়। সেই সময় বর্ধমান শহর কাঞ্চননগর কেন্দ্রিক ছিল।
পিতা-পুত্রের মর্মান্তিক পরিণতি
ইতিহাসবিদ সর্বজিৎ যশ-এর মতে, কৃষ্ণ রাম রায়ের সঙ্গে মেদিনীপুরের চিতুয়াবরদার রাজা শোভা সিংহের দীর্ঘকাল ধরে যুদ্ধ চলেছিল। সেই যুদ্ধেই চন্দ্রকোনায় নিহত হন কৃষ্ণ রাম রায়।
বাবার হত্যা (১৬৯৫ সাল): যুদ্ধে নিহত হন কৃষ্ণ রাম রায়।
পুত্র জগত রাম রায়ের হত্যা (১৭০২ সাল): পিতার মৃত্যুর পর ছেলে জগত রাম রায় প্রথমে বর্ধমান ছেড়ে ঢাকায় চলে যান। পরে ফিরে এসে তিনি পৈত্রিক জমিদারি সামলানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শোভা সিংহের ভাই হিম্মত সিংহের ষড়যন্ত্রে ১৭০২ সালে কৃষ্ণ রাম রায়ের খনন করানো এই কৃষ্ণসায়রের পাড়েই স্নানরত অবস্থায় ছুরির আঘাতে মৃত্যু হয় জগত রাম রায়ের।
প্রতিশোধ ও বারোদুয়ারী
পিতা জগত রাম রায়ের এই নৃশংস হত্যার প্রতিশোধ নিতে সংকল্পবদ্ধ হন তাঁর পুত্র কীর্তি চাঁদ রায়। তিনি হিম্মত সিংহকে হত্যা করেন।
প্রতিশোধের চিহ্ন: পিতার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার আনন্দে কীর্তি চাঁদ রায় বর্ধমানের কাঞ্চননগরের রাজপ্রাসাদের চারিদিকে ১২টি গেট তৈরি করেন, যার নাম দেওয়া হয় বারোদুয়ারী গেট। বর্তমানে সেই ১২টি গেটের মধ্যে কেবল একটি গেটই অবশিষ্ট আছে।
বর্ধমানের কৃষ্ণসায়র আজও তৎকালীন শাসক কৃষ্ণরাম রায়ের প্রজাপ্রিয়তা, জগত রাম রায়ের আত্মত্যাগ এবং ক্ষমতা দখলের এক নির্মম ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।