জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের লড়াই, চিকিৎসায় সুস্থ হয়েও কি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন রকিবরা?

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। এই অভূতপূর্ব আন্দোলনে পুলিশের গুলি ও সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন অসংখ্য ছাত্র-জনতা। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সেই উত্তাল দিনগুলোতে শহিদ হয়েছেন ৮৪৩ জন এবং আহত হয়েছেন ১৪ হাজার ৩৭০ জন। এই বিশাল সংখ্যক আহত ব্যক্তির দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়া এখন জাতীয় পর্যায়ে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গুরুতর আহত ব্যক্তিদের মধ্যে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানো ১৫৪ জনের মধ্যে ১০৫ জন ইতোমধ্যে দেশে ফিরে এসেছেন, তবে এখনো ৩৯ জন আহত ব্যক্তি বিদেশে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আহতদের করুণ বাস্তবতার একটি জলন্ত উদাহরণ উত্তরার বাসিন্দা এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মো. রকিব উদ্দিন। ১৮ জুলাই বিকেলে উত্তরার আজমপুরে আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন তিনি। সে সময় তিনি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সামনে থেকে কোমরে গুলি লাগার ফলে তাঁর জীবন ওলটপালট হয়ে যায়। রকিব উদ্দিনের ভাষায়, “মাংসপেশিতে মোচড় দেয়, বাঁ পা ছোট হয়ে গেছে এবং রাতে ঘুমানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।” পঙ্গু হাসপাতালে গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের চিকিৎসকদের মতে, তিনি পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বিদেশে উন্নত চিকিৎসা নিয়েও তেমন কোনো আশার আলো দেখছেন না তিনি। এ পর্যন্ত তাঁর পায়ে ও কোমরে তিনটি বড় অস্ত্রোপচার হয়েছে এবং চিকিৎসকেরা কোমরের অস্থিসন্ধি প্রতিস্থাপনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) পরিচালক অধ্যাপক আবুল কেনান জানান, আহত ব্যক্তিদের সুচিকিৎসা নিশ্চিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের নিয়মিত পরামর্শ এবং ফলোআপের মাধ্যমে তাঁদের পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে। তবে শুধু শারীরিক চিকিৎসাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং দীর্ঘমেয়াদী কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে আনাও একটি বড় যুদ্ধ।
বিদেশে চিকিৎসার পর ১০৫ জন ফিরে আসলেও, তাঁদের অনেকেরই শারীরিক অবস্থা রকিব উদ্দিনের মতোই নাজুক। অনেকেই এখনও চলাফেরার স্বাভাবিক ক্ষমতা হারিয়েছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আহতদের চিকিৎসার খরচ ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব নিলেও, তাদের সুস্থ জীবনের নিশ্চয়তা দেওয়াটা এক বিশাল মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। আহতদের একাংশ আজও হাসপাতালের বারান্দায় বা ঘরে ফিরেও যন্ত্রণার সঙ্গে লড়ছেন। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে এই আহত যোদ্ধাদের সুস্থতা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। তাঁদের ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া নতুন বাংলাদেশের কাছে এই আহতরাই এখন সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে করুণ এক স্মারক।