ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ইউরিনারি ট্র্যাক্টের ইনফেকশন বেশি হয়, কারণ:
জেনারেল ফিজ়িশিয়ান ডা. ফুয়াদ হালিম বলছেন, ‘‘ব্লাডার বা মূত্রথলি থেকে যে নালীটির মাধ্যমে মূত্র দেহের বাইরে বেরোয়, তার নাম ইউরেথ্রা। ছেলেদের ক্ষেত্রে এই ইউরেথ্রা 15-20 সেমি দৈর্ঘ্যের, মেয়েদের ক্ষেত্রে দূরত্বটা খুব কম, মাত্র 4 সেমি। তাই ছেলেদের ইউরেথ্রা থেকে ব্লাডার পর্যন্ত রাস্তাটা অতিক্রম করতে জীবাণুর যে সময়টা লাগে, মেয়েদের ক্ষেত্রে লাগে তার চেয়ে অনেকটাই কম। তা ছাড়া, মেয়েদের পুরো সিস্টেমটাই শরীরের ভিতরে, ছেলেদের মূত্রনালী শরীরের বাইরে। সেটাও বাড়তি সুবিধে। দু’ নম্বর, ছেলেদের প্রস্রাব আর মলদ্বারের মাঝে অনেকটা দূরত্ব আছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে কিন্তু এই দূরত্বটাও খুব কম। ফলে মলদ্বারের মাধ্যমেও ব্যাকটেরিয়া ইউরিনারি ট্র্যাক্টের সংস্পর্শে আসতে পারে। তিন নম্বর, মলদ্বার আর প্রস্রাবের দ্বারের মাঝে থাকে ভ্যাজাইনা। ভ্যাজাইনা থেকেও কিন্তু সংক্রমণ হওয়ার একটা আশঙ্কা আছে।’’
রেচনক্রিয়ার পর যে সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা, তার কতটা মানা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্নচিহ্ন আছে:
আমাদের দেশে টয়লেট হাইজিন নিয়ে আলোচনাটা শুরুই হয়েছে মাত্র কিছুদিন আগে থেকে। বিশেষ করে মহিলাদের স্বাস্থ্যবিধির ব্যাপারটা মোটামুটি উপেক্ষার দৃষ্টিতেই দেখা হয়েছে দীর্ঘদিন। ছেলেবেলাতে মেয়েদের যদি যথাযথ টয়লেট ট্রেনিং দেওয়া না হয়, তা হলে মলদ্বার ধুয়ে ফেলার পর সেই হাত দিয়ে প্রস্রাবের দ্বার ধোওয়ার একটা প্রবণতা তৈরি হতে পারে এবং সেটা খুব বিপজ্জনক। কারণ মলদ্বার থেকে আসা ময়লা প্রস্রাবের দ্বার দিয়ে শরীরের ভিতরে প্রবেশ করার একটা আশঙ্কা থাকে। তাই মলত্যাগের পর আগে মূত্রদ্বার ধুয়ে তার পর মলদ্বার ধোয়ার অভ্যেস করা উচিত। কোনও পরিস্থিতিতেই একসঙ্গে দু’টি দ্বার ধোয়ার অভ্যেস যেন না হয়, আগে মলদ্বার ধুয়ে সেই হাত মূত্রদ্বারের দিকেও আনা অনুচিত। মূত্রত্যাগের পর যাঁরা টিস্যু ব্যবহার করেন, তাঁরাও টিস্যু সামনে থেকে পিছনে নিয়ে যাওয়ার অভ্যেস করুন। পিছন থেকে সামনে ব্যবহার করবেন না।
পুকুর, নদী, সুইমিং পুল বা সমুদ্রে নেমে স্নান করার সময়ে সংক্রমণ আসতে পারে:
এই সব ক্ষেত্রেও অপরিশোধিত জলের কারণে সরাসরি ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে আসার আশঙ্কা মহিলাদের ক্ষেত্রে বেশি। ভ্যাজাইনাল ট্র্যাক্ট জলের সংস্পর্শে এলে ব্যাকটেরিয়ার উপনিবেশ গড়ে ওঠে সেখানে। তা থেকে সংক্রমণের হার বেশি হয়। শহরে এই সমস্যা সাধারণত দেখা যায় না, গ্রামের মহিলারাই যেহেতু পুকুরে বা নদীতে স্নান করেন, তাই তাঁদের মধ্যেই এটা দেখা যায় বেশি।
ব্লাডারে বেশিক্ষণ টয়লেট ধরে রাখার প্রবণতা থাকলে সংক্রমণের আশঙ্কাও বেশি:
‘‘ধরুন, ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করল আপনার শরীরে, মূত্রত্যাগের মাধ্যমে সেটা আবার শরীর থেকে বেরিয়েও যাবে। কিন্তু অফিসে কাজের চাপ আছে বলে, লম্বা রাস্তা ট্র্যাভেল করছেন বলে বা পাবলিক ইউরিনালের ব্যবস্থা না থাকার কারণে যাঁরা বেশিক্ষণ ব্লাডারে প্রস্রাব ধরে রাখাটাই অভ্যেস করে ফেলেছেন, তাঁরা বিপদে পড়বেন। সেক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া বংশবৃদ্ধি করার সুযোগ পাবে,’’ বলছেন ডা. হালিম।
শাই ব্লাডার সিনড্রোম বা পারইউরেসিস:
এটা এক ধরনের ফোবিয়া। এই সমস্যা থাকলে অন্য মানুষের উপস্থিতিতে পাবলিক টয়লেটে মূত্রত্যাগ করতে পারেন না অনেকে। ইদানীং এ দেশেও এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে বহুক্ষণ ইউরিন হোল্ড করে থাকছেন এঁরা, স্বাভাবিক কারণেই সংক্রমণের আশঙ্কাও বেশি। এ দেশের শহরাঞ্চলে অন্তত 5-7 শতাংশ মানুষের এই সমস্যা আছে। মূলত শহরাঞ্চলে এই সমস্যা দেখা যায়।
কোন কোন ব্যাকটেরিয়া এই সংক্রমণের জন্য দায়ী:
কিছু ব্যাকটেরিয়া আছে যা সাধারণত আমাদের খাদ্যনালীতে থাকে, সেগুলি কোনও কারণে মূত্রনালীতে এসে হাজির হলে তখনই সংক্রমণ হয়। খাদ্যের পাচনের জন্য এগুলি শরীরের প্রয়োজন, কিন্তু কোনও কারণে তা মূত্রনালী এসে গেলেই হয় বিপদ। ই কোলাই এই ধরনের ব্যাকটেরিয়া। এমন কিছু ব্যাকটেরিয়া আছে, যেগুলি সাধারণ অবস্থায় আমাদের শরীরে থাকার কথা নয়। এর কারণে যে সংক্রমণ হয়, তা মারাত্মক আকার ধারণ করতেও বেশি সময় নেয় না। সাধারণত কোনও প্রসিডিওর বা ক্যাথিটার পরানোর পরেও এই ধরনের ব্যাকটেরিয়ার কারণে ইনফেকশন হতে পারে। রক্ত থেকেও সংক্রমণ আসতে পারে, তবে তা রেয়ার, এই চট করে দেখা যায় না।
একবার ইউটিআই হলে কি বারবার সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে:
একবার সংক্রমণ হলে সাধারণত রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়, তখনকার মতো ব্যাকটেরিয়াকে তা প্রশমিত করতে পারে। ক্রনিক ইউটিআই বা রেকারিং ইনফেকশনের ক্ষেত্রে খতিয়ে দেখতে হবে যে সংক্রমণটা কোথায় হচ্ছে। ব্লাডারে? ইউরেটারে? না কিডনিতে চলে গিয়েছে তা? কোথায় ব্যাকটেরিয়া বাসা বেঁধে রয়েছে? ‘‘এ ক্ষেত্রে রোগীর ইউরিন কালচার করে দেখা হয় ব্যাকটেরিয়া কোন গোত্রের। যদি ভিন্ন গোত্রের ব্যাকটেরিয়া থেকে ইউটিআই হয়, তা হলে বুঝতে হবে যে বারবার নতুন করে ইনফেকশন হচ্ছে। যদি একই ফ্যামিলির ব্যাকটেরিয়া থেকে রেকারিং ইনফেকশন হয়, তখন বুঝতে হবে যে ব্যাকটেরিয়া কোথাও বাসা বেঁধে রয়েছে। তার পর সেই অনুযায়ী চিকিৎসা চলবে। দেখতে হবে কিডনিতে স্টোন হয়েছে কিনা, অনেক সময় কিডনিতে কোনও বাধা থাকলেও সেখানে ব্যাকটেরিয়ার বাসা বেঁধে থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়,’’ ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিচ্ছেন ডা. হালিম।
ইউটিআই ঠেকাতে ক্র্যানবেরি খুব কার্যকর বলে শোনা যায়। এটা কি সত্যি?
এ বিষয়ে কোনও প্রামাণ্য তথ্য এখনও হাতে আসেনি, বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষা চলছে। অনেক ডাক্তার প্রেসক্রাইব করেন। তবে একথা বলা যেতে পারে যে ক্র্যানবেরি ক্যাপসুল বা জ্যুস ইউটিআই সারাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।





