লতা মঙ্গেশকর, মহম্মদ রফি কিংবা কিশোর কুমার—ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে এই নামগুলো আজ কেবল কিংবদন্তি নয়, বরং আবেগের সমার্থক। তাঁদের কণ্ঠ ছাড়া বলিউডকে কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু আপনি কি জানেন, একসময় সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের নিজেদের গান নিজেদেরই গাইতে হতো? পর্দার আড়ালে কোনো গায়ক থাকতেন না, ছিল না ‘প্লেব্যাক’ নামক কোনো ব্যবস্থা। ৯০ বছর আগের সেই পুরোনো অভ্যাসের অলিগলি পেরিয়ে আজ আমরা যে আধুনিক বলিউডের স্বাদ পাই, তার পেছনে রয়েছে এক যুগান্তকারী সাংস্কৃতিক বিপ্লব।
১৯৩১ সালে ভারতের প্রথম সবাক ছবি ‘আলম আরা’ মুক্তির পর ভারতীয় সিনেমায় নতুন এক জটিলতা তৈরি হয়। তখনকার দিনে অভিনেতাদের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েই সরাসরি গান গাইতে হতো। বিষয়টি ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। শুটিং চলাকালীন অর্কেস্ট্রার শিল্পীদের ক্যামেরার ফ্রেমের বাইরে লুকিয়ে থাকতে হতো—কখনও সেটের আড়ালে, কখনও জলাশয়ের ধারে, আবার কখনও গাছের আড়ালে। ফলে অভিনয়ের পাশাপাশি অভিনেতাকে হতে হতো দক্ষ গায়ক। এই অদ্ভুত নিয়মের কারণে অনেক প্রতিভাবান অভিনয়শিল্পী পর্দায় সুযোগ হারিয়েছেন, আবার গায়ক হয়েও অনেকে অভিনয়ের খাতিরে ব্রাত্য থেকেছেন। শুটিং প্রক্রিয়াও ছিল অত্যন্ত বিশৃঙ্খল এবং সময়সাপেক্ষ।
ঠিক সেই সময় ত্রাতা হিসেবে আবির্ভাব ঘটে তিন দিকপালের। সংগীত পরিচালক রাইচাঁদ বড়াল, পরিচালক নীতিন বসু এবং রেকর্ডিস্ট মুকুল বসু মিলে এমন এক পদ্ধতির জন্ম দেন, যা ভারতীয় সিনেমার গতিপথই বদলে দেয়। ১৯৩৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ধূপ ছাঁও’ ছবির হাত ধরে প্রথমবারের মতো প্রযুক্তির ছোঁয়ায় জন্ম নেয় ‘প্লেব্যাক সিঙ্গিং’। তাঁদের ভাবনাটি ছিল সহজ অথচ বৈপ্লবিক: স্টুডিয়োয় আগে গান রেকর্ড করা হবে, আর শুটিংয়ের সময় অভিনেতারা সেই গানের সঙ্গে কেবল ঠোঁট মিলিয়ে অভিনয় করবেন।
এই নতুন ব্যবস্থা কেবল শুটিংয়ের বিশৃঙ্খলা দূর করেনি, বরং ভারতের চলচ্চিত্র জগতকে উপহার দিয়েছে লতা মঙ্গেশকর, মহম্মদ রফি, আশা ভোঁসলে এবং কিশোর কুমারের মতো মহাতারকাদের। অভিনেতাদের আর কণ্ঠের সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকতে হয়নি, আর দর্শক পেলেন এক নিখুঁত শ্রুতিমধুর অভিজ্ঞতার স্বাদ। আজকের দিনে বলিউডের প্রতিটি গানে আমরা যে লিপ-সিঙ্কিংয়ের জাদুকরী ছন্দ দেখি, তার মূল ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল সেই ১৯৩৫ সালে। এই প্লেব্যাক সিঙ্গিং না এলে হয়তো ভারত আজও এক ভিন্ন ধরণের ছাঁচে বন্দী থাকতো। চলচ্চিত্র ও সঙ্গীতের মেলবন্ধনে এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল সেই দিনেই, যা আজও বলিউডের প্রাণ হিসেবে টিকে রয়েছে।





