কয়লা কেলেঙ্কারিতে সুপ্রিম কোর্টের ক্লিন চিট: ড. মনমোহন সিংয়ের সততা নিয়ে যা বললেন সোনিয়া গান্ধী

২০১৪ সালের জানুয়ারিতে নিজের কার্যকালের শেষ সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং অত্যন্ত আস্থার সঙ্গে বলেছিলেন, “আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, তৎকালীন গণমাধ্যম বা সংসদের বিরোধী দলগুলোর চেয়ে ইতিহাস আমার প্রতি বেশি সদয় হবে।” তৎকালীন বিরোধী দল ও গণমাধ্যমের লাগাতার দুর্নীতির আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে করা সেই ভবিষ্যদ্বাণী যেন সময় পেরিয়ে এক নতুন সত্যের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের একটি যুগান্তকারী রায়ে কয়লা ব্লক বণ্টন মামলায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে সমস্ত অভিযোগ থেকে নির্দোষ ঘোষণা করার পর, এই বক্তব্য নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সম্প্রতি ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপার্সন সোনিয়া গান্ধী মনমোহন সিংয়ের সততা, রাজনৈতিক অবদান এবং তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে চলা ষড়যন্ত্রের নানা দিক তুলে ধরেছেন।
মনমোহন সিংয়ের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র: সোনিয়া গান্ধী
সোনিয়া গান্ধী তাঁর প্রবন্ধে লিখেছেন, ইতিহাস ড. মনমোহন সিংকে একজন শান্ত, নম্র অথচ অত্যন্ত দূরদর্শী ও সফল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্মরণ করবে। এই সুপ্রিম কোর্টের রায় আমাদের জনপরিসরের অন্যতম একটি মর্মান্তিক অধ্যায়ের অবসান ঘটাল। তাঁর ভাষায়, অসাধারণ সততা ও সত্যবাদিতার অধিকারী ড. সিং-এর বিরুদ্ধে এক সুপরিকল্পিত ও সংগঠিত লবি কাজ করেছিল। আমলাতন্ত্র, গণমাধ্যম, বিচার বিভাগ, সুশীল সমাজ থেকে শুরু করে তৎকালীন বিরোধীরা—সকলেই এই মিথ্যা প্রচারণায় শামিল হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই মিথ্যা প্রচারণার ফলাফল শূন্যই হয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, গত ২৯শে জুলাই সুপ্রিম কোর্ট কয়লা ব্লক বরাদ্দ মামলায় সিবিআই-এর দেওয়া ক্লিন চিট বহাল রাখে এবং নিম্ন আদালতের সমন আদেশ বাতিল করে ফৌজদারি মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেয়। তবে অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, এই ঐতিহাসিক দিনটি দেখে যাওয়ার জন্য ড. মনমোহন সিং আজ আমাদের মাঝে নেই (তিনি ২০২৪ সালের ২৭শে ডিসেম্বর পরলোকগমন করেন)।
প্রধানমন্ত্রী মোদিকে তীব্র কটাক্ষ
বর্তমান মোদী সরকারকে তীব্র আক্রমণ করে সোনিয়া গান্ধী বলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সিংয়ের ওপর নরেন্দ্র মোদীর আক্রমণগুলো কাকতালীয় ছিল না। ২০১৭ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি রাজ্যসভায় মোদীর সেই কটু মন্তব্য—যে “রেইনকোট পরে স্নান করার কলাকৌশল কেবল ড. সিংই জানেন”—আমাদের সংসদীয় ইতিহাসের অন্যতম সর্বনিম্ন অধ্যায়।
সোনিয়া গান্ধীর মতে, সততা ও জবাবদিহিতার মাপকাঠিতে মনমোহন সিংয়ের রেকর্ড বর্তমান সরকারের কার্যকলাপের সম্পূর্ণ বিপরীত। বর্তমান সরকার ইডি ও সিবিআই-এর মতো তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক স্বার্থে চরমভাবে অপব্যবহার করছে। বিরোধী দলে থাকাকালীন কেউ দুর্নীতিগ্রস্ত হলেও, বিজেপিতে যোগ দিলেই তিনি রাতারাতি স্বচ্ছ হয়ে যান—এমন অভিযোগও তোলেন তিনি।
ড. সিংয়ের আমলের অর্থনৈতিক রূপান্তর ও সুশাসন
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর আমলের সাফল্যের কথা স্মরণ করে সোনিয়া গান্ধী জানান, ড. মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বে ভারত অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধির হার এবং ব্যক্তিগত বিনিয়োগে এক বিশাল উল্লম্ফন দেখেছিল, যার মাধ্যমে ভারত মধ্যম আয়ের দেশগুলোর কাতারে জায়গা করে নেয়।
এছাড়াও তিনি উল্লেখ করেন:
বাকস্বাধীনতা ও ছাত্র আন্দোলন: সেই সময়ে ছাত্রছাত্রীরা পেলেট গান বা একে-৪৭-এর ভয় ছাড়াই সরকারের বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার পেত।
জবাবদিহিতা: প্রধানমন্ত্রী ড. সিং নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সংসদ ও গণমাধ্যমের কাছে নিজের কাজের জন্য জবাবদিহি করতেন।
ভারত-মার্কিন পারমাণবিক চুক্তি: তাঁর রাজনৈতিক সাহস ও দূরদর্শিতার ফলেই ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ভারতের বিরুদ্ধে দশকের পর দশক ধরে চলা বৈষম্যের অবসান ঘটিয়েছিল।
পরিশেষে সোনিয়া গান্ধী বলেন, ড. সিং-এর ওপর তৎকালীন সময়ে চালানো আক্রমণগুলো ছিল মূলত তাঁর চমৎকার সুশাসনের রেকর্ড থেকে জনগনের দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার এক মরিয়া প্রচেষ্টা। আজ তাঁর প্রস্থান ঘটেছে ঠিকই, তবে ২০১৪ সালের সেই ভবিষ্যদ্বাণী আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও সত্য প্রমাণিত হয়েছে।