‘অন্য কাউকে বিয়ে করে নাও!’ ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের সময় কেন এমন কথা বলেছিলেন হিনা খান?

ক্যানসারের মতো এক সর্বগ্রাসী ও মারণরোগের সঙ্গে লড়াইয়ের সেই চরম সংকটময় ও অন্ধকার দিনগুলোতে নিজের দীর্ঘদিনের সঙ্গী রকি জয়সওয়ালকে অন্য কাউকে বিয়ে করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন জনপ্রিয় টেলিভিশন অভিনেত্রী হিনা খান। সম্পর্কের সেই অত্যন্ত কঠিন মুহূর্ত, মানসিক টানাপোড়েন এবং জীবনের নানা অজানা দিক নিয়ে সম্প্রতি মুখ খুললেন ৩৮ বছর বয়সি এই প্রতিভাবান অভিনেত্রী। তবে তাঁর অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য হলো, তাঁদের সম্পর্কের এই চরম টানাপোড়েন কোনও পারস্পরিক মতপার্থক্য, দূরত্ব বা মনকষাকষির কারণে তৈরি হয়নি; বরং জীবনের আকস্মিক ও নিষ্ঠুর স্বাস্থ্যসংকটই তাঁদের ভালোবাসার আসল পরীক্ষা নিয়েছিল। ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধের সেই দিনগুলোতে নিজের জীবন সম্পর্কে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় তিনি এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলেন বলে জানান।

নিজের ব্যক্তিগত পডকাস্ট ‘POV’-তে এসে সেইসব স্মৃতি রোমন্থন করেন হিনা। স্তন ক্যানসারের তৃতীয় পর্যায়ে (Stage 3 Breast Cancer) জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার অবস্থাতেই ৩৯ বছর বয়সি রকি জয়সওয়ালের সঙ্গে অত্যন্ত ঘরোয়া ও গোপনীয় আয়োজনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ‘ইয়ে রিশতা কেয়া কেহলাতা হ্যায়’ খ্যাত এই অভিনেত্রী। সম্প্রতি তাঁরা নিজেদের জীবনের প্রথম বিবাহবার্ষিকীও উদযাপন করেছেন। তবে ছিমছাম উপায়ে বিয়ের পরেই তাঁরা যখন ‘পতি, পত্নী, অউর পঙ্গা’ নামের একটি জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো-তে অংশ নেন, তখন একাধিক মহলে তাঁদের তীব্র কটাক্ষের মুখে পড়তে হয়েছিল। সোশ্যাল মিডিয়ার একাংশ এই আকস্মিক বিয়েকে নিছক একটি ‘পাবলিসিটি স্টান্ট’ বা প্রচারের আলোয় থাকার কৌশল বলে দাবি করেছিল, যা নিয়ে সেই সময় কম জলঘোলা হয়নি।

সেই সময়ের কথা মনে করে হিনা দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, তাঁদের সম্পর্কে কঠিন সময় এসেছে ঠিকই, তবে তা মানসিক মেলবন্ধনের অভাবে নয়, বরং ছিল সম্পূর্ণ বাস্তব জীবনের এক নির্মম সংকট। ক্যানসারের কষ্টকর চিকিৎসার কথা উল্লেখ করে হিনা জানান, থেরাপি ও অপারেশনের এমন কিছু অন্ধকার মুহূর্ত এসেছিল যখন তিনি রকিকে স্পষ্টভাবে অন্য কাউকে বিয়ে করার কথা বলেছিলেন। তিনি রকিকে বুঝিয়েছিলেন যে অসুস্থতার ধাক্কায় জীবনের অনেক কিছুই আর আগের মতো স্বাভাবিক থাকবে না। হিনার কথায়, “ওখানেই আসলে সত্যিকারের ভালোবাসার পরীক্ষা হয়, যদিও আমি জেনেশুনে ওকে পরীক্ষা করছিলাম না। রকি যদি সেই সময় অন্য কোনও পথ বেছে নিত, তাহলেও আমি ওর সুখের জন্য খুশিই হতাম। কারণ আমার পাশে থাকার চেয়েও ওর নিজের ভালো থাকা ও খুশি আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।”

তবে সমস্ত প্রতিকূলতা, অসুস্থতা এবং সমাজের জল্পনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রকি এক মুহূর্তের জন্যও হিনার হাত ছাড়েননি। জীবনের সেই চরম দুর্দিনে একনিষ্ঠভাবে শক্ত হাত ধরে পাশে থেকেছেন তিনি। হিনা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে জানান, সেই সময় যাঁরা তাঁর আশেপাশে ও চিকিৎসায় যুক্ত ছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই জানেন যে একমাত্র রকির মানসিক ও শারীরিক সমর্থনের জন্যই তিনি ওই মারাত্মক পরিস্থিতি অতিক্রম করতে পেরেছিলেন। হিনার ভাষায়, “রকি আমার জীবনের ওই পুরো কঠিন ও ভয়ংকর বিষয়টাকে অত্যন্ত সহজ করে দিয়েছিল।” অন্যদিকে, বিয়ের সিদ্ধান্তকে ঘিরে চলা প্রচারভিত্তিক জল্পনা ও সমালোচনার জবাবে হিনা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “মানুষ কে কী বলল বা ভাবল, তাতে আমাদের বিন্দুমাত্র কিছু যায় আসে না, কারণ আমরা নিজেদের সত্যিটা খুব ভালো করেই জানি। প্রচারের সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে ভালোবাসার আসল কারণটাই হারিয়ে যায়।” রকিও সেই সুরেই সুর মিলিয়ে যোগ করেন যে, মানুষ আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ার ভুয়ো খবর ও গুঞ্জন বিশ্বাস করতে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে যে তারা অন্ধের মতো ধরে নিয়েছিল এই বিয়েটা শুধুমাত্র কোনো রিয়ালিটি শোয়ের প্রচারের জন্যই করা হয়েছে।

ক্যানসারের মারণ চিকিৎসার মাঝেই হঠাৎ করে বিয়ের এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেপথ্যের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হিনা জানান যে, তাঁরা দীর্ঘ ১৩ থেকে ১৪ বছর ধরে প্রেম ও লিভ-ইন সম্পর্কের থাকলেও হয়তো স্বাভাবিক ও সুস্থ পরিস্থিতিতে এত তাড়াতাড়ি আইনি বিয়ে করতেন না। স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্টের অধীনে মাসের পর মাস আগেই তাঁদের বিয়ের আবেদন ও নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করা ছিল। হিনা বলেন, “আগামীকাল আমাদের কার জীবনে কী হতে চলেছে, তা আমরা কেউই জানতাম না, তাই জীবনের অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচতেই আমরা তড়িঘড়ি এই বিয়েটা সেরে ফেলি।” উল্লেখ্য, জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘ইয়ে রিশতা কেয়া কেহলাতা হ্যায়’-এর সেটেই হিনা ও রকির প্রথম সাক্ষাৎ ঘটেছিল। যেখানে হিনা ছিলেন কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘অক্ষরা’ এবং রকি ছিলেন শোয়ের সুপারভাইজিং প্রযোজক। সহকর্মী থেকে ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব এবং সেখান থেকেই তাঁদের প্রেমের সুন্দর সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল। দীর্ঘ তেরো বছরেরও বেশি সময় ধরে একে অপরকে ডেট করার পর অবশেষে গত বছর এক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও ব্যক্তিগত আয়োজনে আইনি মতে চিরকালের মতো একে অপরের হাত ধরেছেন এই জনপ্রিয় জুটি।