জাতীয় পতাকার নেপথ্যের আসল নায়ক! যে মুসলিম পরিবারে প্রতিদিন তৈরি হয় দেড় লক্ষ তেরঙ্গা!

যে ত্রিবর্ণ পতাকা প্রতিটি ভারতীয়ের হৃদয়কে অপরিসীম গর্ব ও দেশপ্রেমে ভরিয়ে তোলে, তার নেপথ্যে রয়েছে একটি মুসলিম পরিবারের কয়েক দশকের নিরলস পরিশ্রম ও সাধনা। ১৯৬২ সাল থেকে শুরু হওয়া এই দেশপ্রেমের যাত্রা একই আবেগ ও নিষ্ঠার সঙ্গে আজও সমানভাবে অব্যাহত রয়েছে। প্রজন্ম পেরিয়ে গেছে, সময়ের স্রোতে বহু কিছু বদলে গেছে, কিন্তু জাতীয় পতাকা তৈরির এই পবিত্র কাজটির প্রতি তাদের ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা একটুও কমেনি। বর্তমানে এই পরিবারটি প্রতিদিন প্রায় দেড় লক্ষ ত্রিবর্ণ পতাকা তৈরি করে, যা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে পৌঁছে যায়। স্বাধীনতা দিবসের ঠিক আগের দিনগুলিতে এই কর্মশালায় সারাদিন ধরে সেলাই মেশিন ও যন্ত্রের অবিরাম গুঞ্জন শোনা যায় এবং চারপাশজুড়ে ত্রিবর্ণের রঙ—গেরুয়া, সাদা ও সবুজ—সর্বত্র এক অপরূপ দৃশ্যের সৃষ্টি করে।

রাজধানী দিল্লির ঐতিহাসিক সদর বাজারের একটি সরু গলির ভেতরে অবস্থিত এই বাড়িটি একসময় পরিচিত ছিল সকলের প্রিয় ‘পতাকা চাচা’ আব্দুল গাফফারের নামে, যিনি গত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তবে তাঁর প্রয়াণের পরেও পতাকা তৈরির প্রতি এই পুরো পরিবারের আবেগ, উৎসাহ এবং ঐশ্বরিক নিষ্ঠা এতটুকুও ম্লান হয়নি। বর্তমানে তাঁর ছোট ভাই আব্দুল মালিক এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন এবং অত্যন্ত সফলভাবে তা পরিচালনা করে চলেছেন। সম্প্রতি একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই কাজের পেছনের অজানা ইতিহাস তুলে ধরেছেন।

আব্দুল মালিক সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, তাঁদের এই পারিবারিক ব্যবসাটি মূলত তাঁর বাবা আব্দুল রহমান শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে তাঁর বাবার প্রয়াণের পর, তাঁর বড় ভাই আব্দুল গাফফার এই কাজের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। বিশেষ করে ১৫ই আগস্ট এবং ২৬শে জানুয়ারির মতো জাতীয় উৎসবগুলির আগে এই প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন প্রায় দেড় থেকে দুই লক্ষ পতাকা তৈরি করা হয়। প্রতিটি নিখুঁত পতাকা তৈরি করতে প্রায় ১০ মিনিট সময় ব্যয় হয়। তিনি আরও জানান যে, বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর থেকে তিনি নিজে এই ব্যবসার দেখভাল করছেন এবং সম্প্রতি তিনি সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উৎস থেকে প্রায় ৩৫ লক্ষ টাকার বিশাল অর্ডারের পতাকা সফলভাবে সরবরাহ করেছেন।

তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, স্বাধীনতা দিবস আসতে যখন মাত্র কয়েকমিন বাকি থাকে, তখন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকারি ও খুচরা দোকানদার ও ক্রেতারা তাঁর কাছে ছুটে আসেন। তাঁরা এখান থেকে পাইকারি দরে তেরঙ্গা পতাকা এবং স্বাধীনতা দিবস সংক্রান্ত অন্যান্য সাজসজ্জার সামগ্রী কিনে নিজের রাজ্য ও শহরে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করেন। আব্দুল মালিকের মতে, দেশের এমন কোনো কোণ নেই যেখান থেকে দোকানদার বা ক্রেতারা তাঁর কাছে অর্ডার নিয়ে আসেন না। সুদূর কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত সমস্ত জায়গায় তাঁর তৈরি পতাকা পৌঁছে যায়।

একটি পতাকা তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলতে গিয়ে আব্দুল মালিক জানান যে, এর সঙ্গে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ও জটিল ধাপ জড়িয়ে রয়েছে। প্রথমে সাধারণ কাঁচা কাপড় সংগ্রহ করে তা নিখুঁতভাবে ধোয়া হয়। এরপর তাতে উন্নত মানের ছাপ দেওয়া হয় এবং নিয়মমাফিক রং বসানো হয়। এরপর কাপড়টিকে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয় এবং একটি বড় রোলারে পেঁচিয়ে রাখা হয়। তারপর নির্দিষ্ট মাপে কেটে সেটিকে বিভিন্ন আকারে প্রস্তুত করা হয়। একটি পতাকা পুরোপুরি তৈরি করতে প্রায় ১০ মিনিট সময় লাগে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সামলানোর জন্য বর্তমানে তিনি প্রায় ১,৫০০ থেকে ১,৬০০ জন দক্ষ কর্মী নিয়োগ করেছেন, যারা দিনরাত এক করে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই লক্ষ পতাকা উৎপাদন করেন। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে জানান যে, ত্রিবর্ণ পতাকা তৈরির সময় পবিত্রতা ও সম্মানের বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। পতাকাটি যেন কোনোভাবেই পায়ের নিচে না পড়ে, তা সবসময় পরিষ্কার রাখা হয় এবং অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সঠিকভাবে মোড়কজাত করা নিশ্চিত করা হয়। প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে দেখা হয়।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তাঁদের পরিবারের বিশেষ স্মৃতির কথা উল্লেখ করে আব্দুল মালিক জানান যে, তাঁর বড় ভাই মরহুম আব্দুল গাফফার ‘হর ঘর তেরঙ্গা’ অভিযানের অধীনে বেশ কিছু বড় বড় সরকারি কাজের বরাত পেয়েছিলেন এবং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তা সময়মতো সম্পন্ন করেছিলেন। এরপর একদিন সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তাঁর ফোনে একটি বিশেষ কল আসে এবং তাঁকে সপ্রেমে ‘ফ্ল্যাগ আঙ্কেল’ বা ‘পতাকা চাচা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। সেই থেকে এই পরিবারটি দেশজুড়ে ‘ফ্ল্যাগ আঙ্কেল’-এর পরিবার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তিনি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে বলেন যে, ত্রিবর্ণ পতাকা শুধু তিন রঙের কাপড় নয়; এটি প্রতিটি ভারতীয়ের পরম গৌরবের প্রতীক। প্রথমে তাঁর বাবা, তারপর তাঁর বড় ভাই এবং এখন তিনি নিজে এই পবিত্র দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর প্রবল বিশ্বাস, তাঁদের আগামী প্রজন্মও একইভাবে এই ত্রিবর্ণ পতাকাকে সমুন্নত রাখতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে যাবে।