পুরীর রথযাত্রায় ছুড়ে ফেলা হয় জগন্নাথের প্রসাদ, জেনেনিন নেপথ্যে যে কারণ

রথযাত্রা মানেই ভক্তের ভিড়, রথের রশি টানা এবং মহাপ্রভুর দর্শন। তবে পুরীর রথযাত্রায় এমন কিছু বিশেষ আচার রয়েছে, যা সাধারণ উৎসবের আমেজ ছাপিয়ে এক গভীর আধ্যাত্মিক রহস্যের ইঙ্গিত দেয়। তেমনই একটি ঐতিহ্য হলো ‘অধরপনা’। রথযাত্রার অন্যতম আকর্ষণীয় এই পর্বটি কেবল প্রসাদ বিতরণ নয়, বরং সৃষ্টির ভারসাম্য রক্ষার এক অদ্ভুত প্রক্রিয়া।

অধরপনা কী? পুরীর মন্দিরের ঐতিহ্য অনুযায়ী, রথযাত্রার শেষভাগে এই বিশেষ শরবত তৈরি করা হয়। ছানা, দুধ, চিনি, কলা, জায়ফল এবং সুগন্ধি মশলার মিশ্রণে তৈরি এই পানীয় অত্যন্ত সুস্বাদু। তিনটি বিশাল মাটির পাত্রে (লাঠিয়া) এই শরবত ভরে তা তিনটি রথের ওপর দেবতাদের ঠোঁটের (অধর) খুব কাছে রাখা হয়। শাস্ত্রীয় রীতি অনুযায়ী, দেবতাদের ঠোঁট স্পর্শ করার পর এই পাত্রগুলো রথের ওপরই ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে ফেলা হয়।

ভক্তরা কেন এই প্রসাদ পান না? জগন্নাথ ধামের এই একমাত্র মহাপ্রসাদ যা সাধারণ ভক্ত বা মন্দিরের সেবাইতরা গ্রহণ করেন না। লোককথা ও শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই অর্ঘ্য সাধারণ মানুষের জন্য নয়। এটি মূলত সেই সমস্ত অদৃশ্য শক্তি, অতৃপ্ত আত্মা এবং পূর্বপুরুষদের জন্য নিবেদিত, যাঁরা রথযাত্রার সময় মহাপ্রভুকে দর্শন করতে পুরীতে সমবেত হন।

আধ্যাত্মিক তাৎপর্য কেন এই প্রসাদ মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়? বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন:

  • অদৃশ্য সত্তাদের তৃষ্ণা নিবারণ: রথযাত্রার সময় পুরীতে কেবল মানুষ নয়, অগণিত দৃশ্য ও অদৃশ্য শক্তির সমাবেশ ঘটে। সৃষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং এই অতৃপ্ত আত্মাদের তৃষ্ণা মেটাতেই মহাপ্রভু নিজে এই অর্ঘ্য মাটিতে ছড়িয়ে দেন।

  • মোক্ষবঞ্চিত আত্মাদের মুক্তি: বিশ্বাস করা হয়, ভগবানের ঠোঁট স্পর্শ করা এই প্রসাদ স্পর্শ করলে বা এর আধ্যাত্মিক গুণাগুণ লাভ করলে মোক্ষবঞ্চিত আত্মারাও পরম শান্তি ও তৃপ্তি লাভ করেন।

  • নেতিবাচক শক্তির সন্তুষ্টি: রথের কাঠ এবং ভূমির চারপাশে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন নেতিবাচক বা পার্শ্বদেবতাদের তুষ্ট করার জন্যও এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করা হয়।

পুরীর এই প্রাচীন ঐতিহ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঈশ্বরের করুণা কেবল জীবিতদের জন্য নয়, বরং মহাবিশ্বের সীমানা ছাড়িয়ে তা প্রতিটি অস্তিত্বের কাছেই সমানভাবে পৌঁছে যায়। রথযাত্রার প্রতিটি ধাপ যেন এক একটি গূঢ় দর্শনের প্রকাশ।