রাজ্যে লাগু ‘গুন্ডাদমন আইন’! বিনা বিচারে আটক, এক বছরের জেল—কী এই নতুন নিয়ম?

রাজ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হলো বহুল আলোচিত ‘পশ্চিমবঙ্গ জননিরাপত্তা এবং সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ আইন’, যা রাজ্যবাসীর কাছে ‘গুন্ডাদমন আইন’ নামেই পরিচিত। পালাবদলের পর বিজেপি সরকার বিধানসভায় এই বিল পাস করার পর, সোমবার থেকে তা পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হলো। এই আইন প্রণয়নের নেপথ্যে মূল লক্ষ্য হলো রাজ্যে তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজ এবং অপরাধমূলক কার্যকলাপ কঠোর হস্তে দমন করা।
আইনের মূল বৈশিষ্ট্য ও ক্ষমতা:
গত ২৯ জুন বিধানসভায় পাস হওয়া ‘পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অফ অ্যান্টি-সোশাল অ্যাক্টিভিটিজ বিল, ২০২৬’ এখন থেকে আইন হিসেবে কার্যকর। এই আইনের অধীনে পুলিশ কমিশনার, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ডিআইজি পদমর্যাদার আধিকারিকদের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কোনো আইনি জটিলতা বা বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ছাড়াই সমাজবিরোধীদের আটকের নির্দেশ দিতে পারবেন তাঁরা। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে অভিযুক্তকে সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত আটক রাখা সম্ভব। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি চাইলে সরকার-নির্ধারিত নির্দিষ্ট কমিটি বা কমিশনের কাছে আপিল করার সুযোগ পাবেন।
সমাজবিরোধী কাজের সংজ্ঞা:
এই আইনে সমাজবিরোধী কার্যকলাপের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত রাখা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করা, জনজীবন বা সম্পত্তির ক্ষতি করার আশঙ্কা তৈরি, বৈধ ব্যবসায় বাধা প্রদান, বেআইনিভাবে জমি দখল, এমনকি সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষতি করাও এই আইনের আওতায় পড়বে। এছাড়া খনি, বালি, পাথর বা প্রাকৃতিক সম্পদের অবৈধ উত্তোলনের মতো বিষয়গুলোকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
‘গুন্ডা’ ও শাস্তির সংস্থান:
আইনের সংজ্ঞায় ‘গুন্ডা’ বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যিনি একা বা কোনো গ্যাং বা সিন্ডিকেটের অংশ হিসেবে অভ্যাসগতভাবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। এছাড়া অস্ত্র আইন, মাদক পাচার, অনৈতিক পাচার বা ভারতীয় ন্যায় সংহিতার মতো গুরুতর ধারায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধেও এই আইনের অধীনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। জরিমানার ক্ষেত্রেও আনা হয়েছে কড়া নিয়ম; প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় দ্বিগুণ পর্যন্ত ‘দৃষ্টান্তমূলক ক্ষতিপূরণ’ আদায় করতে পারবে কমিশন।
রাজনৈতিক বিতর্ক:
এই আইনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে চলছে তীব্র চর্চা। মন্ত্রী দিলীপ ঘোষের মতে, রাজ্যের মানুষ সমাজবিরোধীদের উপদ্রবে ক্লান্ত, তাই এই আইনের মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য। অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরের একাংশ একে ‘কালা কানুন’ বলে আখ্যা দিয়েছে। তাদের দাবি, এই আইনের অপব্যবহার করে সরকারবিরোধী কণ্ঠস্বর দমন করা হতে পারে। যদিও রাজ্য সরকারের দাবি, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং শিল্প-বান্ধব পরিবেশ গড়ার স্বার্থেই সিন্ডিকেট রাজ রুখতে এই ‘বাড়তি দাওয়াই’ অপরিহার্য। এই কঠোর আইন প্রয়োগের ফলে রাজ্যের অপরাধের গ্রাফ কতটা নিচে নামে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।