বিশ্বকাপ জ্বরে মোমের জাদু! আহিরীটোলার শিল্পীর হাতে তৈরি হুবহু বিশ্বকাপ ট্রফি দেখে তাক লাগল শহরের

ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ ল্যাপে এখন গোটা বিশ্ব। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে প্রথম সারির চার দেশের লড়াই নিয়ে উত্তপ্ত ফুটবলের মাঠ। একদিকে যখন মাঠের লড়াই তুঙ্গে, অন্যদিকে তখন উত্তর কলকাতার অলিতে-গলিতেও বইছে ফুটবল উন্মাদনার হাওয়া। ভারতীয় দল নেই তো কী হয়েছে? ফুটবলের প্রতি অগাধ ভালোবাসায় রাস্তা সাজিয়ে ফিফার স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছে তিলোত্তমা। আর এই বিশ্বকাপ জ্বরের মাঝেই মোম গলিয়ে আস্ত ‘বিশ্বকাপ’ ট্রফি বানিয়ে তাক লাগিয়ে দিলেন আহিরীটোলার তুহিন মুখোপাধ্যায়। পেশায় ফ্যান্সি মোমবাতি বিক্রেতা হলেও, মনেপ্রাণে তিনি একজন দক্ষ শিল্পী।
শঙ্কর হালদার লেনের পুরনো ধাঁচের বাড়ির একতলায় তুহিনের ছোট স্টুডিও। প্রবেশ করলেই মনে হবে আপনি যেন কোনও নামী ‘ওয়্যাক্স মিউজিয়াম’ বা মোমের জাদুঘরে এসে পড়েছেন। মণ্ডপে দুর্গা প্রতিমা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক প্রতীক, রজনীগন্ধা ফুল কিংবা বাঙালির প্রিয় মিষ্টির প্লেট—কী নেই সেখানে! এসবের ভিড়েই এখন মধ্যমণি হয়ে রয়েছে ফুটবলের সোনালি ট্রফি। ফুটখানেক উচ্চতার এই মোমের বিশ্বকাপ ট্রফি আহিরীটোলার স্টুডিওতে দর্শনার্থীদের নজর কাড়ছে।
মোম শিল্পের এই পারদর্শিতা তুহিনের রক্তে মিশে আছে। প্রায় ৪০ বছর আগে তুহিনের বাবা দীপক কুমার মুখোপাধ্যায় প্রথম মোমবাতিতে রঙের ছোঁয়া দিয়েছিলেন। সাদা স্টিকের বাইরে যে মোমবাতিও শিল্পের বাহন হতে পারে, তা প্রথম তিনিই কলকাতায় দেখিয়েছিলেন। বাবার সেই দেখানো পথেই আজ নিত্যনতুন সৃষ্টিতে মগ্ন তুহিন। শিল্পী জানালেন, শুধু ছাঁচে ফেলে এগুলো তৈরি করা সম্ভব নয়। মোমের সঙ্গে বিদেশের বিশেষ কিছু রাসায়নিক মিশিয়ে তা জমাট করা হয়। এরপর সূক্ষ্মভাবে কেটে কেটে ফুটিয়ে তোলা হয় এই ভাস্কর্যগুলো। এই বিশ্বকাপে মোমের ট্রফিটি তৈরি করতে তুহিনের সময় লেগেছে প্রায় আড়াই দিন।
বন্ধুদের অনুরোধেই মূলত এই বিশেষ রেপ্লিকা বানানোর কথা মাথায় আসে তুহিনের। শিল্পী নিজে লিওনেল মেসির প্রবল ভক্ত। তুহিন বলেন, “আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপের সময়ও ট্রফি বানিয়েছিলাম। এবার ফুটবলের জন্য চারটি ট্রফি তৈরি করেছি। অন্য সকলের মতো আমিও বিশ্বকাপ দেখছি। ফাইনালে আর্জেন্টিনা উঠলে এই মোমের বিশ্বকাপ জ্বালিয়ে ম্যাচ দেখব। জিতলে তো আনন্দ দ্বিগুণ হবেই! ইচ্ছে আছে মেসির একটি কার্টুন ফরম্যাটের মূর্তি বানানোরও।”
বিশ্বকাপ জ্বরের নানান প্রকাশ কলকাতার ইতিউতি। কোথাও রাস্তা সাজছে প্রিয় দলের পতাকায়, কোথাও চলছে বড় স্ক্রিনে ম্যাচ দেখার আয়োজন। এমন সময়ে আহিরীটোলার শঙ্কর হালদার লেনের তুহিন মুখোপাধ্যায়ের এই মোমের বিশ্বকাপ যেন ভালোবাসা, ঐতিহ্য আর শিল্পের এক অপূর্ব ত্রিবেণী সঙ্গম। এক টুকরো মোম আর অদম্য জেদ—এভাবেই শিল্পী তুহিন প্রমাণ করে দিলেন যে, শিল্পের জন্য শুধু ক্যানভাস নয়, প্রয়োজন শুধু সৃজনশীল মন।