জঙ্গলমহলে হাতি ও মানুষের সংঘাত কমাতে এক বড়সড় পরিবেশবান্ধব পরিকাঠামোর স্বপ্ন দেখেছিল কেন্দ্র। কিন্তু সেই স্বপ্নের প্রোজেক্ট ঘিরেই এখন দুর্নীতির কালো ছায়া। ঝাড়গ্রামের গুপ্তমণি এলাকায় ৪৯ নম্বর জাতীয় সড়কের ওপর নির্মীয়মাণ একটি ‘ইকো প্যাসেজ’ বা আন্ডারপাস ব্রিজের একাংশ হঠাৎ হুড়মুড়িয়ে ধসে পড়ায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে এলাকায়। যদিও বরাতজোরে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি, তবে কেন্দ্রের এই কোটি কোটি টাকার প্রকল্পের কাজের মান এবং নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠে গিয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও প্রকল্পের উদ্দেশ্য:
জঙ্গলমহলে ট্রেনের ধাক্কায় বা জাতীয় সড়কে গাড়িচাপায় হাতির মৃত্যু রুখতে বনদফতরের সুপারিশ মেনে জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ এই বিশেষ প্রকল্পটি হাতে নেয়। প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই ইকো প্যাসেজ তৈরির মূল লক্ষ্য ছিল হাতিদের নিরাপদ করিডোর প্রদান করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, জাতীয় সড়ককে উঁচুতে তুলে নিচ দিয়ে ৭ মিটার উচ্চতার একটি প্রশস্ত আন্ডারপাস তৈরি করা হচ্ছিল। উদ্দেশ্য ছিল, হাতিরা যেন লোকালয়ে না ঢুকে বা রাস্তায় না উঠে অনায়াসেই ব্রিজের নিচ দিয়ে যাতায়াত করতে পারে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, ঢালাইয়ের কাজ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই কাঠামো ভেঙে পড়ে।
দুর্নীতির অভিযোগে সরব তৃণমূল:
ঘটনার খবর চাউর হতেই রাজনৈতিক পারদ চড়তে শুরু করে। ঝাড়গ্রামের জঙ্গলমহল এলাকা থেকে ঘটনাস্থলে পৌঁছান গোপীবল্লভপুর বিধানসভার তৃণমূল প্রার্থী অজিত মাহাতো এবং বর্ষীয়ান নেতা দীনেন রায় ও শ্রীকান্ত মাহাতো। ধ্বংসস্তূপ খতিয়ে দেখে সরাসরি কেন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন তাঁরা। অজিত মাহাতো অভিযোগ করেন, “এই ৫০ কোটি টাকার প্রকল্পে অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। কেন্দ্রের নজরদারির অভাবে এবং ঠিকাদারি সংস্থার অব্যবস্থাপনার কারণেই এই ধস। এটি কেবল সরকারি অর্থের অপচয় নয়, বরং জঙ্গলমহলের মানুষের প্রাণের ঝুঁকিও বটে।”
জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের সাফাই বনাম বাস্তব:
নির্মাণে গাফিলতির অভিযোগ উঠলেও জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের একাংশ এক অদ্ভুত দাবি করেছেন। তাঁদের মতে, হাতি চলাচলের ফলে কাঠামোর ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে। যদিও স্থানীয় বাসিন্দা ও বনদফতরের প্রাথমিক তথ্যে গত কয়েকদিনে ওই নির্দিষ্ট রুটে হাতির উপস্থিতির কোনো প্রমাণ মেলেনি। ফলে কর্তৃপক্ষের ‘হাতি-তত্ত্ব’ ধোপে টিকছে না বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। বরং ‘নিম্নমানের কাজ’ এবং ‘কমিশন রাজ’-এর তত্ত্বই জোরালো হচ্ছে। ২০২৫ সাল থেকে শুরু হওয়া এই দেড় বছরের প্রজেক্টটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। মাঝপথে কাজ বন্ধ হওয়ায় ৪৮ নম্বর জাতীয় সড়কে যানজট এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতেও সমস্যা বাড়ছে।





