২৮৬ বছরের ঐতিহ্য! পুরীর মতোই জগন্নাথের ‘হাত ও কান’ রয়েছে গুপ্তিপাড়ার রথে? জানুন অজানা ইতিহাস

বাংলার ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রাগুলোর মধ্যে অন্যতম হুগলির বলাগড়ের গুপ্তিপাড়ার রথ। এই রথযাত্রা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির শিল্পকলা ও সামাজিক ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। এবছর ২৮৬ বছরে পদার্পণ করল এই ঐতিহাসিক রথ। ১৭৪০ সালে স্বামী পীতাম্বরানন্দ এই রথযাত্রার সূচনা করেছিলেন। শোনা যায়, তৎকালীন যাতায়াত ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে পুরী যেতে অক্ষম ভক্তদের জন্য তিনি এলাকাতেই রথ দর্শনের ব্যবস্থা করেন।
গুপ্তিপাড়া রথের গঠনশৈলী অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এই রথটি প্রায় ৩৬ ফুট উঁচু, চারতলা বিশিষ্ট কাঠের কাঠামো। আগে এটি ১৩ চূড়ার থাকলেও বর্তমানে ৯ চূড়ার রথ নির্মিত হয়। রথটি টানার জন্য এর চারদিকেই ব্যবস্থা থাকে, যা বাংলার আর কোথাও খুব একটা দেখা যায় না। রথে থাকা বিভিন্ন পুতুলগুলো প্রাচীন সমাজের প্রতিফলন—মাছ কাটা, সন্তানকে দুগ্ধ পান করানো বা ডাকাতের দৃশ্য—সবই যেন তৎকালীন লোকজীবনের আয়না।
তবে গুপ্তিপাড়া রথের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো জগন্নাথ দেবের গঠন। পুরীর জগন্নাথ দেবের হাত না থাকলেও, গুপ্তিপাড়ার প্রভুর হাত ও কান রয়েছে। পুরোহিত স্যমন্তক গাঙ্গুলীর কথায়, এটি এক অনন্য শিল্পকলা, যেখানে জগন্নাথ দেবকে ‘জ্ঞান মুদ্রা’ প্রদর্শনরত অবস্থায় রাখা হয়েছে। বিশ্বাস করা হয়, প্রভু এই কান দিয়ে ভক্তের কথা শোনেন এবং হাত বাড়িয়ে আশীর্বাদ করেন।
রথযাত্রার অন্যতম আকর্ষণ ‘ভান্ডার লুট’। লোককথা অনুযায়ী, রথে চেপে মাসির বাড়ি যাওয়ার পর লক্ষ্মীদেবীকে মন্দিরে রেখে যান জগন্নাথ। ফিরে না আসায় চিন্তিত লক্ষ্মী দেবী স্বামীকে বশ করার জন্য পঞ্চমীর দিন সরষে পোড়া দিয়ে ‘তুকতাক’ করেন। তাতেও কাজ না হলে তিনি বৃন্দাবনচন্দ্র ও কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে নালিশ জানান। তখন তাদের পাঠানো লেঠেলরা রথের ভান্ডার লুট করে, যা আজও এই উৎসবের বিশেষ রীতি।
উৎসবের দিন সকাল থেকেই রথ ঘিরে ভক্তদের ঢল নামে। বৃন্দাবনচন্দ্র জিউ মঠের প্রধান মন্দির থেকে প্রভু জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে কাঁধে করে রথের চারপাশে প্রদক্ষিণ করিয়ে রথে আরোহণ করানো হয়। স্থানীয় ‘সেন্ট্রাল ইট এনেবলড সার্ভিসেস’ বা আধুনিক পরিকাঠামো না থাকলেও, হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে রথের প্রথম টান শুরু হয় দুপুরে এবং দ্বিতীয় টান বিকেলে। এ বছর রাজ্য সরকার এই ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিয়ে ৫ লক্ষ টাকা অনুদান প্রদান করেছে। এই রথযাত্রা আজও বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে বিরাজমান।