মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তন! ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য ওডিসি’ কি আধুনিক চলচ্চিত্রের নতুন নজির?

কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা ক্রিস্টোফার নোলান মানেই এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এবার তিনি হোমারের গ্রিক মহাকাব্য ‘দ্য ওডিসি’-কে কেন্দ্র করে পর্দায় নিয়ে এসেছেন এক মহাকাব্যিক আখ্যান। ট্রোজান যুদ্ধের পরবর্তী প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই ছবিটি গ্রিক পুরাণের সেই পরিচিত লড়াইয়ের ছায়ায় ঘেরা, যা আমাদের কাছে অনেকটা মহাভারত কিংবা সম্রাট অশোকের কলিঙ্গ যুদ্ধের মতোই তাৎপর্যপূর্ণ। ট্রয় জয়ের পর ইথাকার মহান যোদ্ধা রাজা ওডিসিয়াসের ঘরে ফেরার এই দীর্ঘ ও বন্ধুর পথই ছবির মূল উপজীব্য।

ছবির শুরুতেই দেখানো হয়েছে ট্রয় নগরের পতন। দীর্ঘ যুদ্ধের শেষে ওডিসিয়াস যখন জয়ের মালা পরে নিজের রাজ্য ইথাকায় ফেরার স্বপ্ন দেখছেন, তখন থেকেই শুরু হয় তাঁর জীবনের কঠিনতম লড়াই। এই ঘরে ফেরার পথে তাঁকে মোকাবিলা করতে হয় অশুভ শক্তি, দানবীয় প্রতিকূলতা এবং দৈব বিড়ম্বনার। দীর্ঘ দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যাত্রা কেবল সাহসিকতার গল্প নয়, এটি এক গভীর মানবিক বেদনার দলিল।

वीर गाथा ও আবেগের মেলবন্ধন
ওডিসিয়াসের এই দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে ইথাকার সিংহাসন ও তাঁর পরিবার ছিল চরম সংকটে। একদিকে ওডিসিয়াস যখন সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ আর শত্রুদের সঙ্গে লড়াই করছেন, অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী ও পুত্র নিজেদের রক্ষা করতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন সাম্রাজ্যলোভী ষড়ষন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে। এই সমান্তরাল যুদ্ধের চিত্রকল্প ছবিটিকে কেবল বীরত্বব্যঞ্জক নয়, অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ও হৃদয়স্পর্শী করে তুলেছে। পরিচালক নোলান এই ছবিতে সাহসিকতার পাশাপাশি মানবিক অনুভূতির এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখেছেন, যা দর্শকদের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আচ্ছন্ন করে রাখে। ম্যাট ডেমন, টম হল্যান্ড, অ্যান হ্যাথাওয়ে, জেন্ডায়া ও রবার্ট প্যাটিনসনের মতো একঝাঁক প্রতিভাবান তারকার অভিনয় চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করে তুলেছে।

আইম্যাক্স প্রযুক্তিতে বিস্ময়
‘দ্য ওডিসি’র সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি হলো এর কারিগরি উৎকর্ষ। নোলান এই ছবিটিকে ৭০ মিমি আইম্যাক্স প্রযুক্তিতে ধারণ করেছেন। তাঁর মতে, একজন যোদ্ধার শৌর্যবীর্য এবং যুদ্ধের ভয়াবহতাকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে আইম্যাক্স প্রযুক্তির বিকল্প নেই। ছবিটির মেকিংয়ের অন্যতম বিশেষত্ব হলো এর ‘নন-লিনিয়ার’ বা অ-রৈখিক গল্প বলার ভঙ্গি। এর ফলে দর্শক কোনো মুহূর্তেই মূল কাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না। সঙ্গে হোয়াইট ভ্যান হোয়াইটমার অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফি এবং লুডউইগ গোরানসনের ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর দর্শকদের এক ভিন্ন জগতে নিয়ে যায়। যদিও ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশে আইম্যাক্স থিয়েটারের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবুও প্রযুক্তির এই নতুন দিগন্ত সিনেমা প্রেমীদের মনে এক গভীর প্রভাব ফেলেছে। সব মিলিয়ে, ‘দ্য ওডিসি’ কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়, এটি হাজার বছরের পুরোনো এক পুরাণের আধুনিক ও সফল রূপান্তর।