১৮ বছরের অপেক্ষা শেষ! আহমেদাবাদ ধারাবাহিক বিস্ফোরণ মামলায় বড় রায় আদালতের

২০০৮ সালের ২৬ জুলাই আহমেদাবাদের বুকে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ধারাবাহিক বিস্ফোরণ মামলায় এক ঐতিহাসিক ও কঠোর রায় দিল গুজরাট হাইকোর্ট। নিম্ন আদালতের রায়কে সমর্থন জানিয়ে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার পর আদালত ৩৮ জন দোষীর মৃত্যুদণ্ডের সাজা বহাল রেখেছে। পাশাপাশি, আরও ১১ জন দোষীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজাও অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন ‘ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন’ (IM)-এর সদস্যদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বিচারপতি এ. ওয়াই. কোগজে এবং বিচারপতি সমীর দভের ডিভিশন বেঞ্চ।
ঘটনার সূত্রপাত ২০০৮ সালের সেই ২৬ জুলাই, যখন মাত্র ৭০ মিনিটের ব্যবধানে আহমেদাবাদের বিভিন্ন জনবহুল স্থানে পর পর ২১টি বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল শহর। এই নারকীয় হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ৫৬ জন নিরীহ মানুষ এবং আহত হয়েছিলেন ২০০ জনেরও বেশি। বিস্ফোরণের ধরন ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত; শহরের জনবহুল এলাকা থেকে শুরু করে আহতদের চিকিৎসার জন্য যে হাসপাতালগুলোতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেই হাসপাতালগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। ঘটনার ঠিক কয়েক মিনিট আগেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ইমেল পাঠিয়ে হামলার দায় স্বীকার করে হুমকি দেওয়া হয়েছিল, যা পুরো দেশে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশেষ আদালত এই মামলাকে ‘বিরলতম অপরাধ’ (rarest of rare) হিসেবে অভিহিত করে ৩৮ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিল। দোষীরা সেই রায়ের বিরুদ্ধে গুজরাট হাইকোর্টে আপিল করলেও, ডিভিশন বেঞ্চ সমস্ত আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। আদালত স্পষ্ট করেছে, অপরাধের ভয়াবহতা এতটাই বেশি যে কোনো রকম নমনীয়তা দেখানো সম্ভব নয়।
তদন্তকারী সংস্থার চাঞ্চল্যকর তথ্য অনুযায়ী, এই পুরো হামলার ছক কষা হয়েছিল ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে কেরালায়। এরনাকুলাম জেলায় নিষিদ্ধ সংগঠন ‘স্টুডেন্টস ইসলামিক মুভমেন্ট অফ ইন্ডিয়া’ (SIMI)-এর একটি গোপন প্রশিক্ষণ শিবিরে ৫০ জন সদস্যকে অস্ত্র ও শারীরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। মামলার শুনানিকালে আরও উঠে আসে যে, জেলবন্দি থাকা অবস্থায় ২৪ জন অভিযুক্ত সুপরিকল্পিতভাবে ২১৩ ফুট দীর্ঘ সুড়ঙ্গ খুঁড়ে জেল পালানোর পরিকল্পনা করেছিল, যা শেষ মুহূর্তে জেল কর্তৃপক্ষের তৎপরতায় বানচাল হয়ে যায়।
দীর্ঘ ১৮ বছরের লড়াই এবং জটিল আইনি প্রক্রিয়ার পর এই রায়ের মাধ্যমে মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নিষ্পত্তি ঘটল। বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চের এই কঠোর সিদ্ধান্ত কেবল আক্রান্ত পরিবারগুলোর জন্য ন্যায়বিচারই নয়, বরং সন্ত্রাসবাদীদের জন্য একটি কড়া বার্তাও বটে। এই রায়কে ভারতের বিচারব্যবস্থার এক মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে অপরাধীদের প্রতি যে আদালত কোনো রকম আপস করবে না, তা এই রায়ের মাধ্যমেই পুনরায় প্রমাণিত হলো।