পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের আবহেই রাজ্যজুড়ে চাঞ্চল্যকর খবর দিল জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)। প্রায় ১৭ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রাজ্য থেকে এক বড়সড় এসপিয়োনাজ বা গুপ্তচরবৃত্তি মামলার রহস্যভেদ করল এনআইএ। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এবং এই গোপন নেটওয়ার্কের মূল ‘হ্যান্ডলার’ জাফর রিয়াজ ওরফে রিজভিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নিরাপত্তা মহলের মতে, এটি রাজ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বড়সড় গুপ্তচরবৃত্তি বিরোধী অপারেশন।
কলকাতার এন্টালি এলাকার বাসিন্দা জাফর রিয়াজ পেশায় একজন ব্যবসায়ী। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি আড়ালে থেকে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করছিলেন বলে এনআইএ-র তদন্তে উঠে এসেছে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা বেশ দীর্ঘ। তিনি কেবল সংবেদনশীল তথ্যই পাচার করতেন না, বরং ভারতীয় মোবাইল নম্বরের ওটিপি (OTP) পাচার করে পাকিস্তানি হ্যান্ডলারদের হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট অ্যাক্টিভেট করতে সাহায্য করতেন। এই কৌশলের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে বসে সহজেই ভারতীয় নম্বর ব্যবহার করে গোপন যোগাযোগ রক্ষা করা হতো, যা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নজর এড়িয়ে বছরের পর বছর ধরে চলছিল।
জাফর রিয়াজের অতীত ইতিহাস যথেষ্ট চমকপ্রদ। ২০০৫ সাল থেকে তিনি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াত করতেন এবং লাহোরের বাসিন্দা রাবিয়াকে বিয়ে করেন। তাঁর স্ত্রী ও সন্তানরা পাকিস্তানি নাগরিক। ২০১২ সালে ব্যবসায়িক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে তিনি আর্থিক প্রলোভন ও পাকিস্তানি নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতিতে পাক গোয়েন্দাদের ফাঁদে পা দেন বলে জানা গিয়েছে। এর আগেও তিনি একটি গুপ্তচরবৃত্তি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। তদন্তকারী অফিসারদের মতে, তাঁর ওপর দীর্ঘদিন ধরেই নজর রাখা হচ্ছিল। লুক আউট সার্কুলার জারি করার পর তাঁকে চূড়ান্তভাবে পাকড়াও করা হয়েছে।
আধুনিক গুপ্তচরবৃত্তির এই নতুন ধরন নিয়ে চিন্তিত বিশেষজ্ঞ মহল। আগে ফাইল বা কাগজ পাচারের দিন শেষ, এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ভার্চুয়াল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেই রাষ্ট্রবিরোধী কাজকর্ম চালানো হচ্ছে। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, কলকাতার ব্যবসায়ী মহল থেকে শুরু করে রাজ্যের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলোতে এই নেটওয়ার্কের শেকড় অনেক গভীরে ছড়িয়ে থাকতে পারে। সম্প্রতি মেদিনীপুরে একই অভিযোগে আরও দুজনকে গ্রেফতারের ঘটনা সেই আশঙ্কাই আরও জোরালো করেছে। জাফর রিয়াজকে জেরা করে এই নেটওয়ার্কের বাকি সদস্যদের খোঁজে নেমেছে এনআইএ। এই গ্রেফতারির ফলে রাজ্যের নিরাপত্তা বলয় কতটা সুরক্ষিত এবং পাকিস্তানি গুপ্তচরদের প্রভাব কতটা গভীরে, তা নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনার ঝড় উঠেছে।





