কলকাতা হাইকোর্টে সই জালিয়াতি মামলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শুনানির ঠিক প্রাক্কালে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনি লড়াইয়ে নেমে এল বড়সড় বিপর্যয়। দলের অন্দরের খবর অনুযায়ী, তৃণমূলের দীর্ঘদিনের আইনি মুখ এবং অভিজ্ঞ আইনজীবী তথা সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবার থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্য সরকার এবং দলের কোনো হাই-প্রোফাইল মামলাতেই আর সওয়াল করবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। বর্ষীয়ান এই আইনজীবীর এই নাটকীয় সিদ্ধান্তের ফলে ঘাসফুল শিবিরের আইনি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ল, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে শোরগোল পড়ে গেছে।
সূত্রের খবর, সই জালিয়াতি সংক্রান্ত মামলায় এত দিন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনি প্রতিনিধি হিসেবে লড়ছিলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর ছেলে শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু বুধবার সন্ধ্যায় তৃণমূলের অন্দর থেকে একটি ফোন যায় কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। সেই কথোপকথনে অভিষেকের আইনি দলের সঙ্গে নতুন এক আইনজীবীকে যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে আইনি জগতে দাপিয়ে বেড়ানো কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এই ধরনের হস্তক্ষেপকে মেনে নিতে পারেননি। দীর্ঘদিনের কর্মপদ্ধতি ও ব্যক্তিগত মর্যাদায় আঘাত আসায় তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মামলা থেকে সরে দাঁড়ানোর কঠিন সিদ্ধান্ত নেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পদত্যাগ তৃণমূলের জন্য এক বিশাল ধাক্কা। ১৯৯০-এর দশকের পর থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক লড়াইয়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম থেকে শুরু করে রিজওয়ানুর রহমানের মৃত্যুর মতো স্পর্শকাতর মামলা—প্রতিটি ক্ষেত্রে আইনি ঢাল হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিটি সংকটে তিনি ছিলেন দলের প্রধান ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’। এমন একজন বিশ্বস্ত মানুষের অভিমান করে সরে যাওয়া অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য বড় বিপদের সংকেত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষ করে, সই জালিয়াতি মামলায় সিআইডি-র তদন্ত ও আইনি জটিলতা থেকে রক্ষা পেতে অভিষেক যখন মরিয়া হয়ে আইনি রক্ষাকবচ খুঁজছেন, ঠিক সেই সময়ে কল্যাণের এই সরে দাঁড়ানো তাঁর কৌশলগত অবস্থানে বড়সড় ধাক্কা দিল। প্রশ্ন উঠছে, এর পর কে নেবেন এই আইনি হাল? অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ এবং নতুন আইনজীবী নিয়োগের দিকেই এখন নজর রয়েছে রাজ্য রাজনীতির। তবে কল্যাণের এই ‘বিদ্রোহ’ কেবল একটি আইনি বিচ্ছেদ নয়, বরং শাসকদলের অন্দরে ক্রমবর্ধমান অন্তর্দ্বন্দ্বের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ বলেও চর্চা চলছে। এখন দেখার, এই পরিস্থিতি সামাল দিতে তৃণমূল হাইকমান্ড কী পদক্ষেপ নেয়।





