টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়ায় দীর্ঘদিনের ত্রাস, ফেডারেশন অফ সিনে টেকনিশিয়ান্স অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার দাপুটে সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস অবশেষে পুলিশের জালে। তোলাবাজি, কর্মক্ষেত্রে শ্লীলতাহানি এবং একাধিপত্য কায়েমের অভিযোগে নিউ আলিপুর থানা তাঁকে গ্রেফতার করেছে। স্বরূপের এই গ্রেফতারি যেন টলিউডের সেই অশুভ ‘ব্যান কালচার’-এর বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে। স্বরূপের জমানায় যারা কাজ হারিয়েছিলেন, যারা মেরুদণ্ড সোজা রেখে প্রতিবাদ করেছিলেন, তাদের অনেকেরই মুখ এখন খোলার পালা।
এই আবহে অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তীর একটি ফেসবুক পোস্ট টলিউডের অন্দরের ছবিটা যেন আয়নার মতো পরিষ্কার করে দিয়েছে। ‘হারাধনের দশটি ছেলে’ শিরোনামে সুদীপ্তার এই পোস্ট এখন নেটপাড়ায় ভাইরাল। স্বরূপ বিশ্বাসের রাজত্বে অযৌক্তিক নিয়ম না মানার অপরাধে একঝাঁক পরিচালক ও শিল্পীকে ‘ব্যান’ করা হয়েছিল। দিনের পর দিন কাজ না পেয়েও যারা অনড় ছিলেন, তাদের কুর্নিশ জানিয়েছেন সুদীপ্তা। তিনি লিখেছেন, প্রায় ২০০ জন পরিচালক একসময় ফেডারেশনের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছিলেন, কিন্তু পেটের দায়ে বা কাজের চাপে পরবর্তীতে অনেকেই সমঝোতা করেন। কিন্তু ১০ জন পরিচালক ছিলেন ব্যতিক্রম—যারা সব অপমান সহ্য করেও মাথা নত করেননি।
সুদীপ্তার পোস্ট করা সেই সাহসী ১০ জনের তালিকায় সবার উপরে রয়েছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য। এছাড়াও রয়েছেন আশীষ সেন চৌধুরী, অভিষেক সাহা, বিদুলা ভট্টাচার্য, দেবাশিস চক্রবর্তী, ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী, কিংশুক দে, সুব্রত সেন, সুদেষ্ণা রায় এবং সুমিত দাম। অনির্বাণ ভট্টাচার্য দীর্ঘদিন ব্যান থাকায় কাজ থেকে বঞ্চিত ছিলেন, এমনকি তাঁর গানের দলের অনুষ্ঠানেও বাধা দেওয়া হয়েছিল। এই দুর্দিনে দেব পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এবং তাঁকে নিজের পরিচালিত ছবি ‘দেশু-সেভেন’-এ সুযোগ দিয়েছিলেন।
স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় আরও বড়। এক মেক-আপ আর্টিস্টের দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশি তদন্ত শুরু হয়। ওই শিল্পীর দাবি, গত দুই বছর ধরে তাঁকে কোনো কাজ দেওয়া হয়নি। কাজের সুযোগ চাইতে গেলে উল্টে মোটা টাকা দাবি করা হতো এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হতো। এমনকি স্বরূপের লোকজন বাড়িতে গিয়ে শাসিয়েও এসেছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ করে নিজের অসহায়ত্বের কথা জানানোর পর দেব তাঁকে নিজের ছবিতে কাজের সুযোগ দেন।
স্বরূপ বিশ্বাসের গ্রেফতারি শুধু একজন প্রভাবশালী নেতার পতন নয়, এটি সেই সব শিল্পীদের জয় যারা শিল্পকে তোষামোদের চেয়ে বেশি ভালোবেসেছেন। টলিউডের এই পরিবর্তনের হাওয়া এখন শিল্পী মহলে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে টলিউডের কলাকুশলীরা এখন চাইছেন, শিল্পের জগত যেন কোনো রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত দাপটের শিকার আর না হয়।





