নিট প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে সুপ্রিম কোর্টের চরম বার্তা! পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বাঁচাতে বড় পদক্ষেপ কেন্দ্রের?

দেশের সর্ববৃহৎ ও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা, নিট-ইউজি ২০২৬ (NEET-UG 2026) এর প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সামগ্রিক পরীক্ষা পরিচালনা পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে চলমান তীব্র বিতর্কের আবহে সুপ্রিম কোর্টে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও টার্নিং পয়েন্ট সৃষ্টিকারী শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজকের এই শুনানির সময় দেশের সর্বোচ্চ আদালত কেন্দ্রীয় সরকারকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, জাতীয় স্তরের এই প্রবেশিকা পরীক্ষায় বারবার প্রশাসনিক অনিয়ম, ত্রুটি ও গাফিলতি আর কোনোভাবেই বরদাস্ত বা সহ্য করা হবে না। আদালতের এই কঠোর অবস্থানের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে উপস্থিত বিজ্ঞ সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতে দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ আশ্বাস দিয়ে বলেছেন যে, সরকার কেবল উচ্চপর্যায়ের রাধাকৃষ্ণন কমিটির প্রদেয় সুপারিশগুলোই অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করছে না, বরং তার পরিধি ও গণ্ডি ছাড়িয়েও পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আরও বেশি সুরক্ষিত, আধুনিক ও ত্রুটিমুক্ত করার জন্য একাধিক সুদূরপ্রসারী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এই অত্যন্ত সংবেদনশীল জনস্বার্থ মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী ৩ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ধার্য করা হয়েছে।

শুনানি চলাকালীন বিচারপতি পি.এস. নরসিংহ এবং বিচারপতি অলোক আরাধের সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ বেঞ্চ জোরালোভাবে জানিয়েছে যে, দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থায় পরপর যে গুরুতর ত্রুটিগুলো সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে, কেন্দ্রীয় সরকারকে অবশ্যই তার স্থায়ী ও কঠোর সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। সর্বোচ্চ আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা পুরো বিষয়টির ওপর অত্যন্ত কড়া নজরদারি বজায় রাখবে এবং নিশ্চিত করবে যেন পুরো পরীক্ষা প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক, দুর্নীতিমুক্ত এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়। বেঞ্চ কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করে বলেছে, “আমরা পরিষ্কারভাবে চাই দেশের এই প্রবেশিকা ব্যবস্থাটি যেন পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত ও নিখুঁত হয়। অনুগ্রহ করে এই বিষয়ে আপনার সমস্ত বিস্তারিত জবাব নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হলফনামা আকারে জমা দিন।”

কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে, সরকার বর্তমানে দেশের পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থায় আমূল ও বড় ধরনের সংস্কার সাধনের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। তিনি আদালতকে অবহিত করেন যে, রাধাকৃষ্ণন কমিটির সমস্ত সুপারিশ তো কার্যকর করা হবেই, সেই সঙ্গে পরীক্ষার তথ্য ও প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা বহুলাংশে জোরদার করতে অতিরিক্ত কঠোর পদক্ষেপও গ্রহণ করা হচ্ছে। সমস্ত প্রস্তাবিত কাঠামোগত সংস্কারের বিস্তারিত তথ্য খুব শীঘ্রই একটি পূর্ণাঙ্গ হলফনামার মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের মহামান্য বেঞ্চকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবগতি করানো হবে। সরকারের এই ইতিবাচক যুক্তি ও বক্তব্য মনোযোগ সহকারে শোনার পর আদালত জানিয়েছে যে তারা সরকারের জমা দেওয়া এই বিস্তারিত জবাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখবে।

আদালত শুনানির সময় আরও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মন্তব্য করেছে যে, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এই ধারাবাহিক ভুলের পুনরাবৃত্তির ধারা এবার চিরতরে বন্ধ হওয়া আবশ্যক। সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ কড়া ভাষায় জানিয়েছে যে, জাতীয় পর্যায়ের মেধা যাচাইয়ের পরীক্ষায় এই ধরনের নজিরবিহীন অনিয়ম পুরো দেশের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের জন্য চরম উদ্বেগের বিষয়। ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের লজ্জাজনক পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি আর কখনো না ঘটে, তার জন্য সুদূরপ্রসারী ও কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি নিশ্চিত করা হবে। এর পাশাপাশি, অনলাইন পরীক্ষা পরিচালনা সংক্রান্ত অত্যন্ত দূরদর্শী কিছু প্রশ্নও আদালতের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে সরাসরি জানতে চেয়েছে যে, ভবিষ্যতে ভারতের এই প্রধান নিট-ইউজি পরীক্ষাকে পুরোপুরি কম্পিউটার-ভিত্তিক বা অনলাইন (CBT) পদ্ধতিতে রূপান্তর করার কোনো বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে কি না। আদালত আরও জানতে চেয়েছে যে, পরীক্ষাটি যদি অনলাইনে নেওয়া হয়, তবে সাইবার আক্রমণ বা হ্যাকিং থেকে ছাত্রছাত্রীদের মূল্যবান তথ্যের নিরাপত্তা কীভাবে সুনিশ্চিত করা হবে এবং পরীক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করতে কী ধরনের প্রযুক্তিগত ও সাইবার সিকিউরিটি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অন্যদিকে, এই মামলার আবেদনকারীরা সুপ্রিম কোর্টের কাছে বেশ কিছু জোরালো ও সুদূরপ্রসারী দাবি পেশ করেছেন। তাঁরা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ (NTA)-এর পুরো কার্যক্রমের নিরপেক্ষ ও কঠোর পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন। প্রয়োজনে এই ত্রুটিপূর্ণ সংস্থাকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়ে একটি নতুন, সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং প্রযুক্তিগতভাবে আরও অনেক বেশি সুরক্ষিত প্রতিষ্ঠান গঠনের আর্জি জানানো হয়েছে, যা একশো শতাংশ স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে জাতীয় পরীক্ষাগুলি সফলভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের অগ্রগতি সংক্রান্ত সম্পূর্ণ তদন্ত রিপোর্ট আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে আদালতে জমা দেওয়ার জন্য সিবিআই (CBI)-কে কঠোর নির্দেশ দেওয়ার প্রার্থনা জানানো হয়েছে। আগামী ৩ আগস্ট নির্ধারিত পরবর্তী শুনানির দিনে কেন্দ্রীয় সরকার তাদের পরীক্ষা সংস্কার, কঠোর নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা আদালতের সামনে পেশ করবে।