রোমান শৌচাগারের নিচে ১২০০ বছরের পুরনো রহস্যময় সমাধি! ভিতরে মিলল দুটি শিশুর কঙ্কাল, বিজ্ঞানীদের মাথায় হাত!

তুরস্কের ঐতিহাসিক এবং প্রাচীন শহর ইফিসাসে এক চাঞ্চল্যকর প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার গোটা বিশ্বের বিজ্ঞানীদের চরমভাবে বিস্মিত করেছে। দীর্ঘ খননকার্যের ফলে সেখানে প্রায় ১,২০০ বছরের পুরনো একটি প্রাচীন সমাধি আবিষ্কৃত হয়েছে, যার সবচেয়ে অবিশ্বাস্য দিকটি ছিল এর অদ্ভুত অবস্থান। বিশ্ববিখ্যাত আর্টেমিস মন্দিরের অত্যন্ত কাছে একটি পুরনো এবং দীর্ঘকাল অব্যবহৃত রোমান শৌচাগারের ঠিক নিচেই এই রহস্যময় সমাধিটি নির্মিত হয়েছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকরা যখন অত্যন্ত যত্নসহকারে নির্মিত এই পাথরের সমাধিটির ঢাকনা খোলেন, তখন তাঁরা এর ভেতরে দুটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র কঙ্কাল আবিষ্কার করেন। পরবর্তী প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে যে এই দেহাবশেষ দুটি আসলে দুটি অকালজাত যমজ শিশুর। গবেষকদের সুনির্দিষ্ট ধারণা অনুযায়ী, শিশু দুটি গর্ভাবস্থার প্রায় সাত থেকে সাড়ে সাত মাসের মাথায় জন্মগ্রহণ করেছিল এবং তাদের ক্ষুদ্র হাড়ের গঠন দেখে অনুমান করা হচ্ছে যে তারা সম্ভবত জন্মমুহূর্তে বা অত্যন্ত অল্প সময় বেঁচে ছিল।

এই রোমহর্ষক ও অভূতপূর্ব আবিষ্কার সম্পর্কিত বিস্তারিত গবেষণা প্রতিবেদনটি সম্প্রতি ‘চাইল্ডহুড ইন দ্য পাস্ট’ নামক একটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। অস্ট্রিয়ান একাডেমি অফ সায়েন্সেসের বিশিষ্ট গবেষক ক্যারোলিন পারটিওট এবং লিলি জাব্রানা কঙ্কালগুলো অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানিয়েছেন যে, শিশু দুটির বয়স হুবহু প্রায় একই ছিল, যা থেকে দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত হয় যে তারা যমজ সন্তান ছিল। তবে এই বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত হতে ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে, যার মাধ্যমেই চূড়ান্ত সত্য সামনে আসবে।

এই প্রাচীন কবরটি বিজ্ঞানীদের কেন এত বেশি অবাক করেছিল? গবেষণার এক পর্যায়ে আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে। গবেষকরা দেখতে পান যে দুই শিশুর মধ্যে একজনের ঘাড়ের কাছে একটি অতিরিক্ত পাঁজরের হাড়ের উপস্থিতি রয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞান ও জিনতত্ত্বের ভাষায় এই অস্বাভাবিক শারীরিক অবস্থাটিকে ‘সুপারনিউমেরারি সারভাইকাল রিব’ নামে অভিহিত করা হয়। এটি একটি অত্যন্ত বিরল জিনগত পরিবর্তন বা মিউটেশন, যা গোটা বিশ্বের সমগ্র জনসংখ্যার মাত্র প্রায় এক শতাংশ মানুষের মধ্যে দেখা যায়। এই অতিরিক্ত পাঁজরটি সাধারণত দৈনন্দিন জীবনে বড় কোনো শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি করে না, কিন্তু নবজাতক বা অপরিণত শিশুদের ক্ষেত্রে এটি ‘এইচওএক্স’ (HOX) জিনের একটি জটিল ত্রুটির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এই বিশেষ জিনটি মূলত মানুষের ভ্রূণের শারীরিক বিকাশ নিয়ন্ত্রণ করে। জিনগত এই সমস্যার কারণে ভ্রূণের স্বাভাবিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে এবং কখনও কখনও তা নবজাতকের অকাল মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ইফিসাস শহরে অতীতে আবিষ্কৃত বেশিরভাগ প্রাচীন কবরই সাধারণত মন্দিরের বাইরের নির্ধারিত সাধারণ কবরস্থানগুলোতে পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু এই দুই শিশুকে কোনো সাধারণ গোরস্থানে দাফন না করে সম্পূর্ণ আলাদা এবং একটি অস্বাভাবিক স্থান বেছে নেওয়া হয়েছিল কেন, তা নিয়ে গবেষকদের মনে গভীর প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। গবেষকদের অভিমত অনুযায়ী, সম্ভবত এই শিশুরা অত্যন্ত অপরিণত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছিল এবং তৎকালীন ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী কোনো ধরনের বাপ্তিস্ম (Baptism) গ্রহণের আগেই মারা গিয়েছিল। সেই প্রাচীন যুগে খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যে বাপ্তিস্মের এক গভীর ও বিশেষ তাৎপর্য ছিল। সেই কারণেই সম্ভবত তাদের কোনো পবিত্র সাধারণ কবরস্থানে দাফন করার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

তা সত্ত্বেও, যে সুনিপুণ কৌশলে এই পাথরের কবরগুলো তৈরি করা হয়েছিল, সেগুলোর মজবুত ও সুরক্ষিত গঠন মৃত সন্তানদের প্রতি তাদের শোকাহত পরিবারের গভীর শ্রদ্ধাপূর্ণ বিদায়ের ছবিটিকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। এটি কোনো সাধারণ বা অবহেলার সমাধি ছিল না, বরং তাদের প্রতি পরিবারের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শেষ শ্রদ্ধার এক অনন্য প্রতীক ছিল। তবে খননকার্যের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সময় বিজ্ঞানীরা শিশুদের জন্মদাত্রী মায়ের কোনো ধরনের চিহ্ন বা দেহাবশেষ খুঁজে পাননি। ফলে সেই নারী প্রসবের সময় মারা গিয়েছিলেন নাকি সুস্থভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন, তা নিশ্চিত করে নির্ধারণ করা বর্তমান বিজ্ঞানীদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই প্রাচীন যুগে প্রসূতি মা ও নবজাতক উভয়েরই মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি ছিল, যার ফলে কোনো চূড়ান্ত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। তবুও, এই অবিশ্বাস্য আবিষ্কারটি আজ থেকে প্রায় ১,২০০ বছর আগের প্রাচীন সমাজের আবেগ, মানসিকতা এবং মানুষের ঐতিহ্যের এক বিরল ঝলক আমাদের সামনে তুলে ধরে।