সফদরজং থেকে আরএমএল—রোগীর উপচে পড়া ভিড়ের মাঝেও শূন্য পদের বহর দেখে মাথায় হাত বিশেষজ্ঞদের!

ভারতের সর্ববৃহৎ এবং অত্যন্ত ব্যস্ততম সরকারি হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসক, নার্সিং স্টাফ এবং প্যারামেডিক্যাল কর্মীদের হাজার হাজার পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে রয়েছে। সম্প্রতি সংসদে সরকারের পক্ষ থেকে এই মর্মে যে স্বীকারোক্তি দেওয়া হয়েছে, তাতে চিকিৎসামহলে রীতিমতো চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। লোকসভায় সাংসদ জয় প্রকাশের উত্থাপিত এক সুনির্দিষ্ট লিখিত প্রশ্নের লিখিত জবাবে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী প্রতাপরাও যাদব গত ২৪ জুলাই, ২০২৬ তারিখে দেশের প্রধান কেন্দ্রীয় হাসপাতালগুলির বেহাল পরিকাঠামো এবং কর্মী সঙ্কটের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন। মন্ত্রীর পেশ করা সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী দিল্লির সফদরজং হাসপাতাল, ডঃ রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতাল, লেডি হার্ডিঞ্জ মেডিকেল কলেজ এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (আরএইচটিসি), নজফগড়—এই চারটি প্রধান কেন্দ্রীয় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে বিগত তিন বছর ধরে শূন্যপদের সংকট অত্যন্ত শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সরকারের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই চারটি হাসপাতালের সম্মিলিত অনুমোদিত, পূরণকৃত এবং শূন্য পদের মোট পরিসংখ্যান যেখানে বেশ দীর্ঘ ছিল, তা সামান্য পরিবর্তিত হয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কিছুটা হ্রাস পেলেও সামগ্রিক সংকট কাটেনি। সরকার দাবি করেছে যে, ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন বা ইউপিএসসি (UPSC)-র মাধ্যমে সময়মতো শূন্যপদের চাহিদা পাঠানো, নার্সিং অফিসারদের নিয়োগের জন্য দ্বিবার্ষিক নরসেট (NORCET) পরীক্ষা আয়োজন এবং গ্রুপ বি ও সি ক্যাটাগরির অশিক্ষক পদগুলি পূরণের জন্য সিআরই (CRE) ও স্টাফ সিলেকশন কমিশনের রিক্রুটমেন্ট প্রসেস জোরদার করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও বিভিন্ন দপ্তরে লক্ষ লক্ষ রোগীর চাপ সামলানোর মতো পর্যাপ্ত জনবলের দীর্ঘস্থায়ী অভাব রয়েই গেছে।
এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম মাল্টি-স্পেশালিটি চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সফদরজং হাসপাতালে প্রতিদিন অবিশ্বাস্য রকমের রোগীর চাপ থাকে। প্রতিদিন এখানে বহির্বিভাগে ১০,০০০-এর বেশি রোগী আসেন এবং হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা ৩,০ হাজারেরও বেশি। সরকারি তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ সালে অনুমোদিত ৬৩৩টি ডাক্তারের পদের মধ্যে ৪৭৫টি পূরণ হলেও ১৫৮টি পদ খালি ছিল। অথচ ২০২৫-২৬ সালে অনুমোদিত পদের সংখ্যা বাড়িয়ে ৬৩৮ করা হলেও পূরণকৃত পদের সংখ্যা উল্টে কমে ৪৪৯-এ ঠেকেছে, ফলে বর্তমানে সেখানে শূন্য পদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮৯টিতে। নার্সিং কর্মীদের ক্ষেত্রেও চিত্রটি স্বস্তিদায়ক নয়, যেখানে অনুমোদিত ২,০৮৩টি পদের মধ্যে ১৭১টি খালি রয়েছে। তবে প্যারামেডিক্যাল কর্মীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক, যেখানে ১৩৯২টি পদের মধ্যে এখনও ৫১৪টি পদ শূন্য।
কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার জন্য পরিচিত ডঃ রাম মনোহর লোহিয়া (আরএমএল) হাসপাতালে প্রতিদিন ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ রোগী ওপিডি-তে আসেন এবং শয্যা সংখ্যা ১,৪২০। এখানকার চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে ২০২৩-২৪ সালের ৫৮টি শূন্য পদ বেড়ে ২০২৫-২৬ সালে ৮২টিতে পৌঁছেছে। নার্সিং স্টাফদের ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি দেখা গেলেও, প্যারামেডিক্যাল কর্মীদের ক্ষেত্রে শূন্য পদের সংখ্যা ১৩০-এর কোঠায় রয়েছে। অন্যদিকে, স্ত্রীরোগ ও শিশুরোগের শীর্ষস্থানীয় কেন্দ্র লেডি হার্ডিঞ্জ মেডিকেল কলেজে ১,৪৫০টি শয্যা থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন ৬,০০০-এর বেশি রোগী আসেন। এখানে চিকিৎসকদের শূন্য পদ ৩০ থেকে বেড়ে ৫১ হয়েছে এবং নার্সিং স্টাফদের শূন্য পদ ১২৯ থেকে বেড়ে ১৩৯-এ পৌঁছেছে। চিকিৎসা মহলের মতে, এই বেহাল জনবল সংকট দ্রুত দূর না করা হলে সাধারণ গরিব রোগীদের চিকিৎসা পরিষেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।