৫২ শতাংশ টাকাই আসছে কেন্দ্র থেকে! তবুও কেন ধুঁকছে বাংলার অর্থনীতি? বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ্যে এনে তোলপাড় ফেললেন শমীক!

পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক নীতি নিয়ে সম্প্রতি ফের একবার তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল বা সিএজি (CAG)-এর সাম্প্রতিকতম একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশে আসার পরেই তিনি রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির গুরুতর ইঙ্গিত দিয়েছেন। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের এই সরকারি রিপোর্টে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান অর্থনৈতিক দুরবস্থার এক ভয়াবহ এবং চাঞ্চল্যকর চিত্র প্রকাশ্যে এসেছে, যা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে ইতিমধ্যে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে।
সামাজিক মাধ্যম এক্সে (পূর্বে টুইটার) একটি সুদীর্ঘ ও তথ্যবহুল পোস্ট শেয়ার করে শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট ভাষায় অভিযোগ করেছেন যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ শাসনকালে লাগাতারভাবে রাজ্যের ঋণের বোঝা বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পেলেও সেই বিপুল পরিমাণ অর্থ জনকল্যাণমূলক বা উৎপাদনশীল কোনো খাতে বিনিয়োগ করা হয়নি। আর সেই কারণেই রাজ্যের সার্বিক উন্নয়ন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক সিএজি প্রতিবেদন অনুসারে জানা যাচ্ছে যে, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯,৭২৭ কোটি টাকা, রাজকোষ ঘাটতি বা ফিসকাল ডেফিসিট পৌঁছে গিয়েছে ৬৪,৪৮৮ কোটি টাকায় এবং রাজ্যের মোট ঋণের পাহাড় ইতোমধ্যে ৭.৩৫ লক্ষ কোটি টাকার গণ্ডিও ছাড়িয়ে গেছে।
এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০১৫-১৬ অর্থবর্ষ থেকে শুরু করে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষ পর্যন্ত টানা বিগত দশ বছর ধরে রাজ্যকে লাগাতার রাজস্ব ঘাটতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, রাজ্যের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ৫২ শতাংশ অংশই আসছে সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের নানা অনুদান ও সাহায্য থেকে। অথচ একদিকে যখন কেন্দ্রীয় সাহায্যের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, তখন অন্যদিকে রাজ্যের নিজস্ব মূলধনী ব্যয় বা ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। এর পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান ঋণ পরিশোধের চড়া সুদ এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলোতে বরাদ্দ হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থের সঠিক ও পূর্ণ সদ্ব্যবহার না হওয়া নিয়েও একাধিক গুরুতর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
শমীক ভট্টাচার্য আরও অভিযোগ করেছেন যে, কেন্দ্রের পাঠানো অর্থে পরিচালিত বিভিন্ন জনমুখী প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও নজিরবিহীন স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে, যা আদতে বাংলার সামগ্রিক উন্নয়নকে বহু পেছনে ঠেলে দিয়েছে। দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের মতে, অন্ধভাবে ঋণ গ্রহণ করে তা দিয়ে শুধুমাত্র সরকারের দৈনন্দিন চলতি খরচ মেটানো এবং ঋণের সুদ পরিশোধ করা দীর্ঘমেয়াদে যেকোনো জনপদের অর্থনৈতিক কাঠামোর পক্ষে অত্যন্ত মারাত্মক ও ক্ষতিকর। রাজ্যজুড়ে ক্রমবর্ধমান ভয়াবহ বেকারত্ব, শিল্পের চরম আকাল এবং পুঁজি বিনিয়োগকারীদের রাজ্যে আসার প্রতি তীব্র অনীহার মতো প্রধান সমস্যাগুলোর পেছনে এই সুদূরপ্রসারী আর্থিক অব্যবস্থাপনা অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সিএজির এই বিস্ফোরক রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, কেন্দ্রীয় অনুদান এবং বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য নিয়মিত মোটা অঙ্কের টাকা পাওয়া সত্ত্বেও কেন মমতার আমলে রাজ্যকে এত বিপুল পরিমাণ ঋণের জালে জড়িয়ে পড়তে হলো, তা এক বিরাট রহস্য। কেন রাজ্যে কর্মসংস্থানের পরিকাঠামো ভেঙে পড়েছে এবং কেন নতুন শিল্প গড়ে উঠছে না, সেই প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে। এই বিশাল অঙ্কের টাকা আদতে কোথায় এবং কোন খাতে খরচ হলো, তা নিয়ে অনেকেই সরাসরি বড় ধরনের আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন। এখন দেখার বিষয় হলো, এই স্পর্শকাতর রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর বর্তমান শাসক দল এই ভয়াবহ আর্থিক অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কীভাবে নিজেদের সাফাই দেয় এবং পরিস্থিতির মোকাবিলা করে।