রাজনীতির ময়দানে তিনি নেই, তবু কুর্সিতে অবিচল! বিহারের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের নির্বাচনী ব্যতিক্রম কেন?

বিহারের রাজনীতিতে নীতীশ কুমার (Nitish Kumar) নিঃসন্দেহে এক অভিনব ব্যতিক্রম। রাজ্যের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি প্রায় দুই দশক ধরে প্রশাসনের কেন্দ্রে, কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো—তিনি নিজের রাজনৈতিক জীবনের মূল মঞ্চ, অর্থাৎ বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে নামেন না।

ভোটে না দাঁড়ানোর ব্যতিক্রমী কৌশল
নীতীশ কুমারের নির্বাচনী ইতিহাসে চোখ রাখলে দেখা যায়, ১৯৮৫ সালের পর থেকে তিনি আর একবারও বিধানসভা ভোটে দাঁড়াননি। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ১৯৯৫ সাল, তবে তখন তিনি লোকসভা সদস্য থাকায় ওই আসনটি ছেড়ে দেন।

এরপর থেকে তিনি নিয়মিতভাবে রাজ্যের আইন পরিষদ (Legislative Council) বা বিধান পরিষদের সদস্য হিসেবেই মুখ্যমন্ত্রীর পদে আসীন হয়ে আসছেন।

বিধানসভা নয়, পরিষদপথেই রাজনীতি
রাজনৈতিক যাত্রা শুরু: নীতীশ কুমারের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭৭ সালে বিধানসভা ভোটে। পরবর্তী দুটি নির্বাচন—১৯৮০ ও ১৯৮৫—তেও লড়েছিলেন, কিন্তু জয় আসে কেবল একবার (১৯৮৫ সালে হরনৌত কেন্দ্র থেকে)।

জাতীয় রাজনীতিতে: এরপর তিনি জাতীয় রাজনীতিতে পা বাড়িয়ে ১৯৮৯ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিক ছ’টি লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হন। তাঁর শেষ সরাসরি নির্বাচনী লড়াই ছিল ২০০৪ সালে, যখন তিনি বারহ ও নালন্দা—দুটি আসনেই লড়ে নালন্দায় জয়ী হন।

মুখ্যমন্ত্রীত্বের প্ল্যাটফর্ম: ২০০৫ সালে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই তিনি বিধান পরিষদকেই তাঁর রাজনীতির প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। প্রথম মেয়াদে (২০০৫–২০১২) পরিষদ সদস্য হওয়ার পর ২০১২, ২০১৮ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে তিনি ফের নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর বর্তমান মেয়াদ চলবে ২০৩০ সাল পর্যন্ত।

কেন এই ‘পছন্দের সিদ্ধান্ত’?
বিধানসভা ভোটে না দাঁড়ানোর কারণ প্রসঙ্গে নীতীশ কুমার নিজেই ব্যাখ্যা দিয়েছেন, এটি কোনো “বাধ্যবাধকতা” নয়, বরং তাঁর “পছন্দের সিদ্ধান্ত”।

২০১৫ সালের ভোটের আগেও তিনি স্পষ্ট করেছিলেন, ব্যক্তিগতভাবে ভোটে দাঁড়াতে চান না, কারণ এতে তাঁর রাজনৈতিক দায়িত্ব একটি মাত্র কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। তাঁর মতে, বিধান পরিষদ একটি “সম্মানজনক প্রতিষ্ঠান”।

দীর্ঘ মেয়াদি মুখ্যমন্ত্রীত্বের রেকর্ড
২০০৫ সালের নভেম্বরে প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে নীতীশ কুমার প্রায় অবিচ্ছিন্নভাবে ক্ষমতায় রয়েছেন। যদিও ২০১৪–১৫ সালে নয় মাসের জন্য পদত্যাগ করেছিলেন, কিন্তু দ্রুতই তিনি রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে ফের ক্ষমতায় ফিরে এসেছেন। বারবার মিত্র বদলালেও (বিজেপি, আরজেডি, আবার বিজেপি), মুখ্যমন্ত্রীর আসন কখনও তাঁর হাতছাড়া হয়নি।

২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা ভোটেও নীতীশ কুমার প্রার্থী হচ্ছেন না, কিন্তু তাঁর নেতৃত্বেই জেডিইউ–বিজেপি জোট রাজ্যে ক্ষমতা রক্ষার লড়াইয়ে নামছে। ভোটের ময়দানে না নেমেও রাজনীতিতে অদ্বিতীয় থাকার এই কৌশল নীতীশ কুমারকে ভারতীয় রাজনীতিতে এক বিরল অধ্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।