রথ মানেই শুধু মাসির বাড়ি যাওয়া নয়! এই দিনে কেন ভগবান জগন্নাথের ওপর চরম চটেছিলেন মহালক্ষ্মী?

রথযাত্রা মানেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে তিনটি বিশাল রথ, লাখো ভক্তের উলুধ্বনি আর মাসির বাড়িতে জগন্নাথ দেবের যাত্রার উৎসব। কিন্তু এই ভক্তি ও আনন্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক পরম রোমান্টিক ও ঘরোয়া দাম্পত্যের কাহিনী। আপনি কি জানেন, জগন্নাথ দেব কেন মাসির বাড়িতে যাওয়ার সময় দেবী মহালক্ষ্মীর কাছে ‘দোষী’ সাব্যস্ত হয়েছিলেন? পুরী মন্দিরের সেবাইত বিজয় কৃষ্ণ সিংহালীর বয়ানে উঠে এসেছে দেবদম্পতির সেই অদেখা অভিমানের উপাখ্যান।

গল্পটা শুরু হয় আষাঢ়ের শুক্ল দ্বিতীয়ায়। কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই প্রভু জগন্নাথ তাঁর বড় ভাই বলভদ্র এবং বোন সুভদ্রাকে নিয়ে মাসির বাড়ি অর্থাৎ গুণ্ডিচা মন্দিরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। এদিকে, মন্দিরে ঘুম থেকে উঠে স্বামীকে না দেখতে পেয়ে দেবী লক্ষ্মীর মনে দানা বাঁধে তীব্র অভিমান। সংসারের সমস্ত দায়িত্ব ফেলে এমন আকস্মিক যাত্রায় দেবী এতটাই ক্ষুব্ধ হন যে, তিনি জগন্নাথ দেবের মূল মন্দিরের রান্নাঘরের উনুন ভেঙে ফেলার মতো কাণ্ড ঘটিয়ে বসেন!

তবে গৃহিণীর রাগ এখানেই থামেনি। রথযাত্রার পঞ্চম দিনে, যা ‘হেরাপঞ্চমী’ নামে পরিচিত, দেবী লক্ষ্মী সশরীরে পালকিতে চেপে পৌঁছে যান গুণ্ডিচা মন্দিরের দুয়ারে। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, প্রভু জগন্নাথ ভক্তদের নিয়ে আনন্দ উৎসবে মগ্ন, আর মন্দিরের দরজা তাঁর জন্য বন্ধ। এই উপেক্ষা সহ্য করতে না পেরে লক্ষ্মীদেবী রাগে ও অভিমানে জগন্নাথের রথের একটি চাকা ভেঙে দেন! শাস্ত্রে বর্ণিত এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, দেবতাদের সংসারেও ভালোবাসা আর অভিমানের টানাপোড়েন কতটা গভীর হতে পারে। এরপর লোকলজ্জার ভয়ে তিনি মূল পথ না মাড়িয়ে এক গোপন পথ দিয়ে শ্রীমন্দিরে ফিরে আসেন।

গল্পের শেষটা আরও মিষ্টি। উৎসবের শেষে যখন জগন্নাথ দেব উল্টো রথে চেপে নিজ মন্দিরে ফেরেন, তখন তিনি দেখেন সিংহদুয়ার বন্ধ। ভেতরে অভিমানী স্ত্রী! তখন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে প্রভু শুরু করেন অনুনয়-বিনয়। শেষমেশ প্রিয়তমা স্ত্রীর মান ভাঙাতে তিনি ওড়িশার বিখ্যাত নরম তুলতুলে রসগোল্লা নিজের হাতে দেবীকে উপহার দেন। মিষ্টির জাদুতে নিমেষেই গলে যায় লক্ষ্মীদেবী সব রাগ।

সেবাইত বিজয় কৃষ্ণ সিংহালীর মতে, দেব-দেবীর এই ঘরোয়া লীলা আসলে আমাদের সাধারণ মানুষের সংসার করার এক বড় শিক্ষা। তিনি বলেন, “দাম্পত্য জীবনে ভুল বোঝাবুঝি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তা যেন বাইরের লোকের কান পর্যন্ত না পৌঁছায়। ঘরের অশান্তি ঘরের ভেতরেই মিষ্টি মুখে মিটিয়ে নেওয়াই আদর্শ দম্পতির ধর্ম।” পুরীর রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের জটিলতাকে কীভাবে ভালোবাসার পরশে সহজ করা যায়, সেই বার্তাও দেয়।