মৃত্যুপুরী বাংলাদেশ! আড়াই লক্ষ পরিবার গৃহহীন, উদ্ধারকাজে নামল সেনা ও নৌবাহিনী

বাংলাদেশে একটানা ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত ৫ জুলাই থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত মাত্র এক সপ্তাহে বন্যায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৪ জনেরও বেশি মানুষ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ২ লক্ষ ৬৭ হাজার পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে প্রশাসন। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সরকারি আধিকারিকরা।
রাজধানীর বিপর্যস্ত অবস্থা:
কেবল প্রত্যন্ত অঞ্চল নয়, বৃষ্টির দাপটে রাজধানী ঢাকার অবস্থাও শোচনীয়। শহরের বেশিরভাগ নিচু এলাকা জলের তলায় তলিয়ে গিয়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রাত ১২টা থেকে রবিবার ভোর ৬টা পর্যন্ত গড়ে ৭৬ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সোম ও মঙ্গলবারও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে, যার ফলে পরিস্থিতির উন্নতির কোনো লক্ষণ আপাতত নেই।
উদ্ধারকার্যে সেনার সাহায্য:
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজ দ্রুত করতে বাংলাদেশ সরকার সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে মাঠে নামিয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মীরাও আর্তদের উদ্ধারে হাত লাগিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে খোলা হয়েছে অসংখ্য আশ্রয় শিবির। বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর মুখপাত্র জানিয়েছেন, বেশিরভাগ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ভূমিধসের কারণে। এছাড়া জলে ডুবে এবং দেওয়াল চাপা পড়েও অনেক প্রাণহানি হয়েছে। বিশেষ করে গত ৮ জুলাই কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে ভয়াবহ ধসের ঘটনায় সাত শিশু ও তাদের এক শিক্ষকের মৃত্যু হয়েছে, যা গোটা দেশকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে।
ঝুঁকিতে নদী তীরবর্তী এলাকা:
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বেশিরভাগ জেলাই বর্তমানে বন্যা কবলিত। বাংলাদেশের ৪৫টি প্রধান নদীর মধ্যে সাতটির জলস্তর বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে এবং আরও বেশ কয়েকটি নদী বিপদসীমার খুব কাছাকাছি রয়েছে। উত্তর-পূর্ব এবং উত্তর-পশ্চিমের জেলাগুলোর পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। মৌলবিবাজারসহ বেশ কিছু দুর্গম এলাকায় এখনো সরকারি সাহায্য পুরোপুরি পৌঁছানো সম্ভব হয়নি বলে স্থানীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের আধিকারিকরা জানিয়েছেন।
প্রশাসনের উদ্বেগ:
জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস সাধারণত বাংলাদেশে বর্ষাকাল বা বন্যাপ্রবণ সময় হিসেবে পরিচিত। কিন্তু জুলাইয়ের শুরুতেই এই তীব্র বন্যা প্রশাসনকে গভীর চিন্তায় ফেলেছে। ভৌগোলিক কারণে প্রতি বছর বন্যা হলেও, এবারের আকস্মিক ও ব্যাপক বৃষ্টিপাত পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে সরকার বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় রেখে উদ্ধার ও ত্রাণ কাজ চালানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।