ভোটার তালিকা থেকে উধাও ৬ কোটি নাম! নির্বাচন কমিশনের এই বিরাট পদক্ষেপে তোলপাড় দেশ

দেখতে দেখতে এক বছর পূর্ণ হলো নির্বাচন কমিশনের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) প্রক্রিয়ার। আর এই এক বছরের অভিযানেই সারা দেশ থেকে মুছে ফেলা হলো প্রায় ৬ কোটি ভোটারের নাম। কমিশনের এই নজিরবিহীন পদক্ষেপে একদিকে যেমন ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে আশার আলো দেখছেন বিশেষজ্ঞরা, অন্যদিকে তেমনই শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এই বিপুল সংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়াটি দুটি প্রধান পর্যায়ে সম্পন্ন হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে বিহার থেকে প্রায় ৬৫ লাখ নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও রাজস্থানের মতো জনবহুল রাজ্যগুলো থেকে সরানো হয়েছে আরও ৫.১৮ কোটি নাম। গত বছর জুন মাসে শুরু হওয়া এই বিশেষ অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল ভোটার তালিকাকে ‘ডেড উড’ বা ত্রুটিমুক্ত করা। মৃত ব্যক্তি, একই ব্যক্তির একাধিক নাম, অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং ঠিকানা পরিবর্তন করে অন্য রাজ্যে চলে যাওয়া ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তি, বুথ লেভেল অফিসারদের (BLO) কঠোর ফিল্ড ভেরিফিকেশন এবং ডেটা অ্যানালিটিক্সের মাধ্যমে এই তথ্য যাচাই করা হয়েছে। আধিকারিকদের দাবি, আধার কার্ড, রেশন কার্ডসহ বিভিন্ন নথির সঙ্গে মিলিয়ে এই সংশোধন প্রক্রিয়ায় জাল ভোট এবং বুথ ক্যাপচারিংয়ের মতো অনিয়ম কমানোর পথ প্রশস্ত হলো।

তবে কমিশনের এই দাবির বিপরীতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সোচ্চার হয়েছে। তাদের অভিযোগ, এটি গণতন্ত্রের ওপর আঘাত। বিরোধীদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় অনেক প্রকৃত ভোটারের নামও অনিচ্ছাকৃতভাবে বাদ পড়েছে, বিশেষ করে দরিদ্র, শ্রমিক এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে। অনেক পরিবার অভিযোগ করছে যে, বয়স্ক মানুষ বা কাজের জন্য বাইরে থাকা ব্যক্তিদের নামও তালিকা থেকে উধাও হয়ে গেছে, যার ফলে তাঁদের ভোটাধিকার হরণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিহারের মতো রাজ্যগুলোতে এই ইস্যুতে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বিরোধীদের আরও দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নির্দিষ্ট এলাকায় ভোটার ব্যাংককে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একাংশ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলছেন যে, বছরের পর বছর মৃত ব্যক্তির নাম তালিকায় থেকে যাওয়ায় ভোট চুরির সুযোগ থাকত, যা এখন বন্ধ হবে। অন্যদিকে, প্রকৃত ভোটাররা হয়রানির শিকার হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। বিশেষ করে যারা প্রথমবার ভোটার হতে চেয়েছিলেন, তাঁদের অনেকের নাম তালিকায় না থাকায় বিভ্রান্তি বাড়ছে।

নির্বাচন কমিশন যদিও আশ্বস্ত করেছে, যাদের নাম ভুলবশত বাদ পড়েছে, তারা নতুন করে আবেদন করলে নিয়ম মেনে পুনরায় তালিকাভুক্ত করা হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি নির্ভুল ভোটার লিস্ট গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। তাই আসন্ন নির্বাচনগুলোতে এই বিশাল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার প্রভাব কী হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।