“ভিডিও দেখার সময় নেই!” দিল্লিতে পুলিশি দমনপীড়নের জরুরি শুনানি এক লহমায় খারিজ করল সুপ্রিম কোর্ট

দিল্লির যন্তর মন্তরে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের বলপ্রয়োগ ও দমনপীড়ন নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে শুনানির আবেদন এক লহমায় খারিজ করে দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, এই মুহূর্তে আদালত আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত এ বিষয়ে কোনো ধরনের আইনি হস্তক্ষেপ করবে না। এমনকি পুলিশের বিরুদ্ধে পেশ করা নির্মম নির্যাতনের কোনো ভিডিও দেখার অনুরোধও সরাসরি নাকচ করে তিনি অত্যন্ত কড়া সুরে মন্তব্য করেছেন, “আমাদের ভিডিও দেখার সময় নেই।”

বুধবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বিশেষ বেঞ্চে জনৈক আইনজীবী এই চাঞ্চল্যকর মামলাটির জরুরি শুনানির আর্জি পেশ করেছিলেন। তাঁর মূল দাবি ছিল, সাম্প্রতিক ‘নিট-ইউজি ২০২৬’ (NEET-UG 2026) প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং এনটিএ (NTA)-র আমূল সংস্কারের দাবিতে অহিংস আন্দোলনরত সাধারণ পড়ুয়া ও যুবকদের ওপর পুলিশের এই ‘নির্মম আচরণ’ অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং দেশের শীর্ষ আদালতের অবিলম্বে এতে হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন। কিন্তু আবেদন পেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই প্রধান বিচারপতির সাফ জবাব ছিল— “আমাদের সময় নষ্ট করবেন না, নিজের সময়ও নষ্ট করবেন না।”

আদালতে আবেদনকারী আইনজীবী পুনরায় জোর দিয়ে জানান যে, আন্দোলনকারীরা এনটিএ-র সংস্কার এবং নিট দুর্নীতি নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন এবং তাঁরা পুলিশের লাঠিচার্জের জঘন্য ভিডিও প্রমাণ হিসেবে জমা দিতে চান। এর প্রত্যুত্তরে প্রধান বিচারপতি সংক্ষেপে বলেন, “ধন্যবাদ। আমরা ভিডিও দেখতে চাই না। ভিডিও দেখার সময় আমাদের নেই।” এরপর আর কোনো যুক্তিতর্ক না শুনেই আদালত আবেদনটি সম্পূর্ণ খারিজ করে দেয়।

উল্লেখ্য, এই অভিনব ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামের রাজনৈতিক সত্ত্বাটির জন্মও খোদ প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি পূর্ববর্তী বিতর্কিত মন্তব্যের সূত্র ধরেই হয়েছিল। চলতি বছরের শুরুর দিকে একটি মামলার শুনানিতে তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, বেকার যুবকদের একাংশ সাংবাদিকতা ও আন্দোলনের নামে ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকার মতো আচরণ করছে। সেই মন্তব্য ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র তোলপাড় শুরু হলে প্রধান বিচারপতি পরে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন যে তাঁর বক্তব্যটি কেবল ‘ভুয়ো ও জাল ডিগ্রিধারীদের’ উদ্দেশ্যে ছিল। কিন্তু দেশের ক্ষুব্ধ বেকার যুবসমাজ সেই ‘ককরোচ’ শব্দটিকে অত্যন্ত ক্ষুরধার ব্যঙ্গাত্মক হাতিয়ার বানিয়ে রাতারাতি গড়ে তোলে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সোশ্যাল মিডিয়া কাঁপিয়ে এই দল সুবিশাল এক ছাত্র আন্দোলনে রূপ নেয়।

গত এক মাস ধরে রাজধানীর যন্তর মন্তরে লাগাতার অবস্থান আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে এই সিজেপি। তাদের প্রধান ও মূল দাবিগুলি হলো—নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সম্পূর্ণ দায় নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে এবং ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA)-র কাঠামোগত পূর্ণাঙ্গ সংস্কার সাধন করতে হবে। এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে ময়দানে নেমেছিলেন প্রখ্যাত পরিবেশবিদ ও উদ্ভাবক সোনম ওয়াংচুক। তাঁকেও অনশনরত অবস্থায় পুলিশ জোরপূর্বক আটক করে সরিয়ে দিলে দেশজুড়ে ক্ষোভের আগুন আরও বেশি দপ করে জ্বলে ওঠে। সম্প্রতি আন্দোলনকারীদের পূর্বঘোষিত ‘চলো সংসদ’ অভিযানকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী ধস্তাধস্তি ও ব্যাপক আটকের ঘটনা ঘটে।

এর আগে গত মঙ্গলবার দিল্লি হাইকোর্টও একই ধরনের একটি আবেদন খারিজ করে মন্তব্য করেছিল, “আদালতকে এই রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে টেনে আনবেন না।” এবার খোদ সুপ্রিম কোর্টেও বড় ধাক্কা খাওয়ায় সিজেপি আন্দোলনের আইনি লড়াইয়ের পথ আপাতত ভীষণভাবে অবরুদ্ধ হলো বলেই মনে করছে দেশের আইন ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মহল।