বেঁচে থাকার জন্য নিজের সন্তানই পণ! দারিদ্র্যের অভিশাপে শৈশব হারাচ্ছে আফগান কিশোরীরা

আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতায় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। একদিকে চরম আর্থিক সংকট, অন্যদিকে তালিবান শাসিত কঠোর বিধিনিষেধের কারণে দেশটিতে বাল্যবিবাহ ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের গর্ভধারণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ‘জান টাইমস’ এবং ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক অমানবিক বাস্তব চিত্র। সেখানে দারিদ্র্যের কশাঘাতে পিষ্ট বহু পরিবার বেঁচে থাকার রসদ জোগাতে বা ঋণের বোঝা মেটাতে নিজেদের নাবালিকা কন্যাদের বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
প্রতিবেদনে সিমা (নাম পরিবর্তিত) নামে এক কিশোরীর মর্মান্তিক জীবনকাহিনি তুলে ধরা হয়েছে, যা যে কাউকেই শিউরে তোলার মতো। ২০২১ সালে তালিবান ক্ষমতা দখলের সময় সিমা ষষ্ঠ শ্রেণি পাশ করেছিল, স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার। কিন্তু তালিবানের কঠোর ফতোয়ায় মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এর মাত্র দুই মাসের মাথায় তার বাবার চাপে সিমা তার চাচাতো ভাইকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়। শারীরিক নির্যাতনের মুখে নতিস্বীকার করে ১৩ বছর বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসা সিমা আজ ১৮ বছর বয়সে এসে চার সন্তানের মা। বারবার অকাল গর্ভাবস্থার ধকল আর সংসারের ভারী কাজের চাপে সে এখন শারীরিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। সে নিজেই জানিয়েছে, কিডনির ব্যথা ও মাথাব্যথায় তার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, নিজেকে তার ৭০ বছরের বৃদ্ধার মতো মনে হয়।
হাসপাতালগুলোর তথ্য বলছে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। উত্তর আফগানিস্তানের একটি সরকারি হাসপাতালেই চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ১৮ বছরের কম বয়সী ৪২ জন কিশোরী সন্তান প্রসব করেছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এই অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীরা প্রায়ই এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি (জরায়ুর বাইরে ভ্রূণের বৃদ্ধি) বা গুরুতর শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছে। পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার অভাবে ইতিমধ্যে দুই কিশোরী মায়ের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
স্কুলে যাওয়ার বয়সে জল আনা, গবাদি পশুর সেবা কিংবা রুটি তৈরির মতো কঠিন কাজ এবং ক্রমাগত মাতৃত্বের ভারে আফগান মেয়েদের শৈশব ও স্বাস্থ্য দুই-ই ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলের মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় এবং তালিবানের নারী-বিরোধী নিষেধাজ্ঞার কারণে এই পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল আকার ধারণ করছে। একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়ার এই চিত্র প্রমাণ করে, আফগানিস্তানে মেয়েদের জীবনের নিরাপত্তা আজ কতটা বিপন্ন।