বালেন শাহের ‘ক্লিন সিটি’ অভিযান নাকি অমানবিকতা? গৃহহীনদের হাহাকারে ফুঁসছে কাঠমান্ডু

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু বর্তমানে চরম উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের সাম্প্রতিক ‘অবৈধ বাসস্থান উচ্ছেদ’ অভিযানকে কেন্দ্র করে কাঠমান্ডুর রাজপথ এখন প্রতিবাদী স্লোগানে মুখরিত। শহরের সৌন্দর্য রক্ষা এবং অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে পরিচালিত এই অভিযানের জেরে শত শত মানুষ আজ ঘরছাড়া। বিক্ষুব্ধ তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সকলেই এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করছেন।
রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভকারীদের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে—“দরিদ্রদের ওপর অত্যাচার বন্ধ করো”, “মানবাধিকার মেনে চল” এবং “আশ্রয় দাও, উচ্ছেদ নয়”। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে যে, পুলিশকে নিয়ন্ত্রণের জন্য লাঠিচার্জ করতে হয়েছে, যার ফলে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন।
বালেন শাহ, যিনি একসময় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র হয়ে শহর পরিচ্ছন্নতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছেছিলেন, আজ তাঁর সেই উন্নয়নমুখী পদক্ষেপই সমালোচনার মুখে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক অভিযানে প্রায় ২,৬০০টি পরিবার উচ্ছেদ হয়েছে। অথচ, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে মাত্র ৩২৫টি পরিবারের জন্য। বাকি হাজার হাজার মানুষ এখন খোলা আকাশের নিচে, তীব্র মানবিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের দুর্দশা চরম আকার ধারণ করেছে।
অন্যদিকে, বালেন শাহের সমর্থকগোষ্ঠী এবং প্রশাসনের যুক্তি, কাঠমান্ডুর নদীর তীর, পার্ক এবং সরকারি জমি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ স্কোয়াটারদের দখলে ছিল, যা শহরের পরিবেশ দূষিত করার পাশাপাশি অপরাধপ্রবণতা বাড়াচ্ছিল। বালেন শাহ তাঁর বিবৃতিতে জানিয়েছেন, “শহরকে বাসযোগ্য করাই আমাদের লক্ষ্য। আমরা কাউকে অমানবিকভাবে উচ্ছেদ করছি না, বরং যারা সহযোগিতা করছেন, তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”
তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, উন্নয়নের নামে যেভাবে মানবিকতাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা নেপাল সরকারের কাছে স্বচ্ছ এবং মানবিক পুনর্বাসন নীতির দাবি জানিয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, শহরকে বিশ্বমানের করে তোলার এই লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের জীবন কি তবে বলির পাঁঠা হতে থাকবে? একদিকে উন্নয়নের স্বপ্ন, অন্যদিকে হাজার হাজার মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার করুণ বাস্তবতা—এই দুইয়ের দোলাচলে নেপালের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থায় এক নতুন অস্থিরতা দানা বেঁধেছে।