ট্রেন থেকে উধাও কোটি কোটি টাকার লিনেন! চুরি রুখতে ডিজিটাল পথে হাঁটছে ভারতীয় রেল

ভারতীয় রেলের এসি কোচের বিছানার চাদর, কম্বল, তোয়ালে এবং বালিশের মতো লিনেন সামগ্রী চুরি যাওয়া দীর্ঘদিনের সমস্যা। সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে মাসের মধ্যে ভারতীয় রেল থেকে ১.২৭ কোটিরও বেশি লিনেন সামগ্রী চুরি হয়েছে। আরটিআই-এর রিপোর্টে জানা গেছে, ১৬টি জোনের ৫৪টি ডিভিশনে গত চার বছরে খোয়া যাওয়া এই সামগ্রীর আর্থিক মূল্য আনুমানিক ১০৪.৫১ কোটি টাকা। এই বিশাল আর্থিক ক্ষতির দায়ভার প্রায়শই ঠিকাদারদের ওপর গিয়ে পড়ে, যা রেল পরিষেবার গুণমান ও কর্মপরিবেশকে প্রভাবিত করছে। রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের নির্দেশে রেলের ‘৫২ সপ্তাহে ৫২টি সংস্কার’ প্রকল্পের আওতায় এই চুরি রুখতে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

ডিজিটাল নজরদারি ও কিউআর কোড
চুরি আটকাতে রেল কর্তৃপক্ষ ‘কোচ মিত্র’ মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে। উত্তর-পশ্চিম রেলওয়ের বিকানের ডিভিশনে ইতিমধ্যে এই অ্যাপের মাধ্যমে লিনেন বিতরণ ও সংগ্রহের কাজ ডিজিটালভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রতিটি লিনেন সামগ্রীতে স্বতন্ত্র কিউআর কোড বরাদ্দ করার পরিকল্পনাও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। রেলওয়ে লন্ড্রি থেকে শুরু করে ট্রেনে বিতরণ এবং পুনরায় সংগ্রহ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে এই কিউআর কোড স্ক্যান করা হবে, ফলে কোনো সামগ্রী খোয়া গেলে মুহূর্তের মধ্যে শনাক্ত করা সহজ হবে।

সিসিটিভি ও নজরদারি বৃদ্ধি
চুরি রুখতে কোচের ভেতরে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর কাজ জোরকদমে চলছে। বিশেষ করে আম্বালা ডিভিশনের মতো জায়গায় নজরদারি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। লিনেন রাখার জন্য নির্দিষ্ট সুরক্ষিত জায়গা তৈরি করা হয়েছে, যাতে তা কোনোভাবেই বাইরে না যেতে পারে। এছাড়াও যোধপুর ডিভিশন লিনেন যাচাই করার পদ্ধতিকে আরও কঠোর করেছে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অবহেলার জন্য কর্মীদের কাউন্সেলিং করানো হচ্ছে এবং দক্ষিণ রেলের সালেম ডিভিশন পরিদর্শন ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছে।

যাত্রীদের সচেতনতা ও পুলিশের ভূমিকা
রেল কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। রাঁচি ডিভিশন সরাসরি বিছানার চাদরের প্যাকেটের ওপর নির্দেশ লিখে ছাপিয়েছে, যেখানে যাত্রীদের যাত্রা শেষ হওয়ার ৩০ মিনিট আগে ব্যবহৃত লিনেন জমা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, ভোপাল এবং দক্ষিণ পশ্চিম রেল প্রতিটি এসি কোচের জন্য পৃথক অ্যাটেনডেন্ট নিয়োগ করেছে। ঠিকাদার কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক পুলিশ ভেরিফিকেশন চালু করা হয়েছে।

রেলওয়ে সুরক্ষা বাহিনী (আরপিএফ) এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। রেলওয়ে সম্পত্তি (অবৈধ দখল) আইন অনুযায়ী, রেলের সম্পত্তি চুরি একটি জামিন অযোগ্য অপরাধ। আরপিএফ সদস্যেরা এখন ট্রেন ও ডিপোগুলিতে আকস্মিক পরিদর্শন এবং রাত্রিকালীন টহল বাড়িয়েছেন। লিনেন ফেরত না দিলে সন্দেহজনক যাত্রীদের ব্যাগ তল্লাশি করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রেলের এই সমন্বিত উদ্যোগ চুরি রোধ করে এসি কোচের পরিষেবা আরও স্বচ্ছ ও সুরক্ষিত করবে বলে মনে করছেন রেল বিশেষজ্ঞরা।