বড়সড় ধাক্কা বাজারে! অতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ ও ক্ষতিকর অণুজীবের অভিযোগে জনপ্রিয় ৪ কোম্পানির ৮টি পণ্য নিষিদ্ধ করল বিএসটিআই

জনপ্রিয় ও বিখ্যাত চার প্রতিষ্ঠানের আট ধরনের পণ্য সরকারি নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ায় বাজার থেকে অবিলম্বে প্রত্যাহারের কঠোর নির্দেশ জারি করেছে দেশের পণ্যের মান প্রণয়ন ও নিয়ন্ত্রণকারী শীর্ষ সংস্থা ‘বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন’ (বিএসটিআই)। সংস্থাটির পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, পরীক্ষাগারে করা মান পরীক্ষায় ওই সমস্ত নির্দিষ্ট পণ্যগুলিতে অতিরিক্ত মাত্রায় ক্ষতিকর প্রিজারভেটিভ এবং মানবদেহের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অণুজীবের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। সাধারণ জনগণের জনস্বার্থ এবং ভোক্তা অধিকার সুরক্ষার কথা মাথায় রেখেই প্রতিষ্ঠানগুলিকে অবিলম্বে নতুন করে মানসম্মত অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সমস্ত পণ্যের উৎপাদন, বাণিজ্যিক বিক্রয় ও সরবরাহ থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি, ইতিমধ্যে বাজারে ছড়িয়ে থাকা ওই সমস্ত পণ্যগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে দোকান ও বাজার থেকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে।

যে চারটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির পণ্য এই নিষিদ্ধ ও প্রত্যাহারের কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, সেগুলি হলো– ফ্রেশ গার্ডেন এগ্রো রিসোর্সেস, কাজী ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, অলিভ বাংলাদেশ লিমিটেড এবং ডেকো ফুডস লিমিটেড। এই সমস্ত স্বনামধন্য কোম্পানির উৎপাদিত জুস, প্রসাধন সামগ্রী যেমন শ্যাম্পু ও লোশন, এবং জনপ্রিয় আইসক্রিমসহ মোট আট ধরনের পণ্যের ওপর এই শাস্তিমূলক নিষেধাজ্ঞা নেমে এসেছে। উল্লেখ্য, এর আগেও গত সপ্তাহে মাত্রাতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগে অন্য তিনটি প্রতিষ্ঠানের অন্তত তিন ধরনের খাদ্যপণ্য বাজার থেকে তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল বিএসটিআই। এমনকি ২০১৯ সালেও বহুল বিক্রিত বেশ কিছু বিখ্যাত ব্র্যান্ডের লবণ, বিভিন্ন ধরনের মসলা এবং ভোজ্যতেলসহ ৫২টি ভিন্ন ধরনের পণ্য বাতিলের নির্দেশ দিয়েছিল এই সংস্থাটি। বিএসটিআইয়ের নিয়মিত বাজার তদারকি ও স্যাম্পলিং প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এই ধরনের অভিযান পরিচালিত হয়ে থাকে, তবে প্রতিবারই জনমনে একটি বড় প্রশ্ন দেখা দেয় যে, বিএসটিআইয়ের পূর্বানুমোদন পাওয়ার পরও কীভাবে কোনো ভোগ্যপণ্য মান পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয় এবং সেই সঙ্গে বাজারে অন্যান্য যেসব সমমানের পণ্য রয়েছে, সেগুলির সার্বিক নিরাপত্তা ও মান নিয়েও সাধারণ ভোক্তাদের মনে তীব্র সংশয় তৈরি হয়।

বিএসটিআইয়ের পক্ষ থেকে বিস্তারিতভাবে জানানো হয়েছে যে ঠিক কোন কোন পণ্যের বিরুদ্ধে এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং কেন নেওয়া হয়েছে। ফ্রেশ গার্ডেন এগ্রো রিসোর্সেস-এর উৎপাদিত জনপ্রিয় আমের আচারে অনুমোদিত নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে প্রিজারভেটিভ বা সংরক্ষণকারী রাসায়নিক উপাদান পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে অত্যন্ত সুপরিচিত ও জনপ্রিয় কাজী ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের উৎপাদিত ‘বেলিসিমো’ ব্র্যান্ডের রোটোন্ডো হ্যাজেলনাট কোটেড চকলেট আইসক্রিমটিকেও অবিলম্বে বাজার থেকে তুলে নিতে বলা হয়েছে, কারণ এই নির্দিষ্ট আইসক্রিমের একটি ব্যাচে বাংলাদেশ মানদণ্ডে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি মিল্ক সলিড নট-ফ্যাট অর্থাৎ দুধের চর্বিবিহীন কঠিন উপাদান শনাক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া, অলিভ বাংলাদেশ লিমিটেড-এর ‘লাবণ্য’ ব্র্যান্ডের মিল্ক স্কিন লোশন, অ্যালোভেরা স্কিন লোশন, ফেসওয়াশ মোরিঙ্গা প্লাস মাচা ফোমিং মিল্ক এবং তুলসী ও অ্যালোভেরা ভ্যারিয়েন্টের শ্যাম্পুতে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর অণুজীবের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। পাশাপাশি, ডেকো ফুডস লিমিটেড-এর ‘ডেকো ফ্রুট ফান্ডা’ ব্র্যান্ডের ম্যাঙ্গো ও অরেঞ্জ ভেরিয়েন্টের সফট ড্রিংক পাউডারে সরকারি মানমাত্রার তুলনায় প্রয়োজনীয় ভিটামিন ‘সি’ কম থাকার কারণে সেগুলিকে বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিএসটিআইয়ের সার্টিফিকেশন মার্কস উইংয়ের পরিচালক মো. আলাউদ্দিন হুসাইন গণমাধ্যমকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলিকে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে এবং এর মাঝেই তাদের বাজার থেকে সমস্ত সরবরাহকৃত মালামাল সফলভাবে প্রত্যাহার করে নিতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্যগুলি বাজার থেকে সরিয়ে না নিলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং দোষী প্রতিষ্ঠানগুলিকে বড় অঙ্কের জেল ও জরিমানা ভোগ করতে হতে পারে। সরকারের এই কঠোর নির্দেশনা অমান্য করলে বিএসটিআই সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত বা চিরতরে বাতিল করার পূর্ণ ক্ষমতা রাখে। এছাড়া ‘বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন আইন, ২০১৮’ অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের, জরিমানা আদায় এবং কারাদণ্ডসহ অন্যান্য কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এই আটটি নির্দিষ্ট পণ্য কীভাবে বাছাই করা হলো, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক জানান যে এটি কোনো নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা ব্র্যান্ডকে বিশেষভাবে টার্গেট করে পরিচালিত কোনো অভিযান নয়, বরং এটি তাদের নিয়মিত ও ধারাবাহিক বাজার তদারকির অংশ হিসেবে সম্পূর্ণ এলোমেলোভাবে বা র‍্যান্ডম স্যাম্পলিং পদ্ধতিতে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করার ফল। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন যে, বাজারে বর্তমানে উপলব্ধ অন্য পণ্যগুলি আদৌ নিরাপদ কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে, কারণ গুটিকয়েক উৎপাদক ও সরবরাহকারীর অনিয়মের কারণে সামগ্রিক ভোক্তা আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। বিএসটিআই জানিয়েছে যে এই মান পরীক্ষার প্রক্রিয়াটি একটি চলমান ও অবিরাম ধারাবাহিক পদ্ধতি এবং ভবিষ্যতে পণ্যের মান রক্ষার্থে এই ধরনের কঠোর অভিযান আরও জোরালোভাবে অব্যাহত থাকবে।