তৃণমূলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ কাণ্ডে বিরাট মোড়! ইডির সরাসরি তলবে হাজিরা দিতে চলেছেন প্রাক্তন সাংসদ

সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ সংক্রান্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল মামলায় তদন্তের গতি আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। এই মামলার সূত্র ধরে এবার সরাসরি তলব করা হয়েছে দলের প্রাক্তন সাংসদ তথা প্রভাবশালী নেতা শুভাশিস চক্রবর্তীকে। ইডি সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহেই তাঁকে কেন্দ্রীয় সংস্থার নির্দিষ্ট দফতরে সশরীরে হাজির হয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হওয়ার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই আকস্মিক তলবকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে জোরদার জল্পনা ও গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে।

তদন্তকারী সংস্থার একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে যে, সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিগত দিনে হওয়া আর্থিক লেনদেন, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নথিপত্র এবং অ্যাকাউন্ট পরিচালনা সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শুভাশিস চক্রবর্তীর কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য ও ব্যাখ্যা জানতে চায় ইডি। ঠিক কোন পরিস্থিতিতে এবং কী উদ্দেশ্যে এই সমন পাঠানো হয়েছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে কৌতূহল তুঙ্গে। মূলত এই মামলার মূল সূত্রপাত হয়েছিল সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত আইনি জটিলতা ও আর্থিক অসঙ্গতির প্রেক্ষিতে। দীর্ঘ তদন্ত চলাকালীন আদালতে দলের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার জোরালো আবেদন জানানো হয়েছিল। সেই আবেদনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন গোপন নথি, আর্থিক সিদ্ধান্ত এবং দলীয় স্তরে নেওয়া সমস্ত প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

তদন্তে ইতিমধ্যেই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে যে, এর আগে দলেরই অন্যতম শীর্ষ নেতা অরূপ বিশ্বাস আদালতে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন। সেই বিশেষ আবেদন এবং তার বিপরীতে আদালতে জমা পড়া সমস্ত আইনি নথিও বর্তমানে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার মূল তদন্তের আওতার মধ্যে রয়েছে। তদন্তকারীরা প্রধানত জানতে চাইছেন যে, ঠিক কী ধরনের পরিস্থিতিতে সেই আবেদন করা হয়েছিল এবং সেই নির্দিষ্ট সময়ে দলীয় স্তরে উচ্চপর্যায়ে কী ধরনের নীতিগত বা আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এই বিষয়গুলো পরিষ্কার করতে গিয়েই শুভাশিস চক্রবর্তীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

ইডি সূত্রে আরও প্রকাশ, এই চাঞ্চল্যকর মামলায় ইতিমধ্যেই একাধিক ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের গোপন জবানবন্দি ও বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে। পাশাপাশি মামলার সঙ্গে যুক্ত প্রয়োজনীয় ব্যাংক স্টেটমেন্ট, কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড এবং অন্যান্য গোপন নথিপত্রও সংগ্রহ করা হয়েছে। সেই সমস্ত সংগৃহীত তথ্য এবং বয়ানগুলো পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতেই এবার প্রাক্তন সাংসদ শুভাশিস চক্রবর্তীকে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা।

তদন্তকারীদের সাফ দাবি, আর্থিক লেনদেনের এই পুরো জট ও প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট করতে প্রতিটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যক্তিগত বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে। সেই কারণেই সুনির্দিষ্ট কৌশলের অংশ হিসেবে ধাপে ধাপে একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আগামী সপ্তাহে শুভাশিস চক্রবর্তীর জেরা পর্ব সম্পন্ন হওয়ার পর এই হাই-প্রোফাইল তদন্তে আরও কিছু নতুন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসতে পারে বলে জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

উল্লেখ্য, অতীতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার এই ধরণের একের পর এক কড়া পদক্ষেপ নিয়ে বারবার তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ উগরে দিয়েছে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। তাদের তরফ থেকে বারবার অভিযোগ তোলা হয়েছে যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কেন্দ্রীয় সংস্থাকে ব্যবহার করে বিরোধী দলকে চাপে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, ইডির পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে যে আদালতের নির্দিষ্ট নির্দেশ এবং তদন্তে হাতে আসা অকাট্য তথ্যের ভিত্তিতেই সম্পূর্ণ আইন মেনে সমস্ত পদক্ষেপ করা হচ্ছে। ফলে তৃণমূলের বিতর্কিত অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ মামলায় শুভাশিস চক্রবর্তীর এই তলব গোটা তদন্ত প্রক্রিয়ায় একটি নতুন ও নাটকীয় মাত্রা যোগ করেছে। আগামী সপ্তাহের জিজ্ঞাসাবাদে ঠিক কী কী চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসে, এখন সেদিকেই গভীর নজর আটকে রয়েছে রাজনৈতিক মহল ও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা উভয়েরই। যদিও এই সাম্প্রতিক সমন ও তলব নিয়ে সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে প্রাক্তন সাংসদ শুভাশিস চক্রবর্তীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর তরফ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া সম্ভব হয়নি।