বুধবার রক্তক্ষয়ী পতনে কাঁপল দালাল স্ট্রিট! নিমেষে ধূলিস্যাৎ সাড়ে ৪ লক্ষ কোটি টাকা, মাথায় হাত বিনিয়োগকারীদের

বুধবার ভারতীয় শেয়ার বাজারে এক রক্তক্ষয়ী ও ভয়াবহ পতন প্রত্যক্ষ করেছে দালাল স্ট্রিট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান চরম সামরিক উত্তেজনা, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন করে শুল্ক বৃদ্ধির মারমুখী হুমকি এবং বৈশ্বিক নানা অর্থনৈতিক উদ্বেগের জেরে বিনিয়োগকারীদের মনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর জেরে সপ্তাহের মাঝে সেনসেক্স ও নিফটি প্রায় ১ শতাংশ পতন নিয়ে তাদের লাগাতার নিম্নমুখী প্রবণতা বজায় রেখেছে। এই আকস্মিক ও ধস নামানো বিক্রির চাপে বাজারজুড়ে হাহাকার শুরু হয়েছে।

আজকের এই বিপুল দরপতনের জেরে সেনসেক্স একসময় ৮০০ পয়েন্টেরও বেশি খসে পড়ে দিনের সর্বনিম্ন ৭৭,৩৮৪ পয়েন্টের কোঠায় নেমে আসে। পাশাপাশি, নিফটি ৫০ সূচকও ২০০ পয়েন্টের বেশি পিছিযে ২৪,০০০ পয়েন্টের মনস্তাত্ত্বিক গণ্ডির নিচে থিতু হয়েছে। এই ধারাবাহিক বিক্রির প্রবল চাপে বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে (বিএসই) তালিকাভুক্ত সমস্ত কোম্পানির সম্মিলিত বাজার মূলধন বা মার্কেট ক্যাপ এক ধাক্কায় প্রায় ৪.৬৬ লক্ষ কোটি টাকা কমে ৪.৭৯ লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি নেমে এসেছে। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা যেভাবে ঘনীভূত হচ্ছে, তাতে আগামী দিনে বিনিয়োগকারীদের আরও বেশি সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে।

কোম্পানিগুলির শেয়ারের দরের দিকে তাকালে দেখা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমদানি করা জেনেরিক ওষুধের উপর একটি নতুন ও কঠোর পর্যায়ক্রমিক শুল্ক পরিকল্পনা ঘোষণা করার পর থেকেই ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলির শেয়ারে সবচেয়ে বড় ধস নেমেছে। এই প্রস্তাবিত পরিকল্পনার অধীনে, বর্ধিত শুল্ক সরাসরি কার্যকর করার আগে ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলিকে দুই বছরের একটি অবকাশ দেওয়ার কথা বলা হলেও বিনিয়োগকারীরা আগে থেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। সেনসেক্সে অন্তর্ভুক্ত স্টকগুলির মধ্যে ইন্ডিগোর শেয়ারের দর সবচেয়ে বেশি মার খেয়ে ৩ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে, দেশের শীর্ষ ব্যাংক স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (এসবিআই)-এর শেয়ারের দরও প্রায় ২ শতাংশ কমে বিনিয়োগকারীদের বড় ধাক্কা দিয়েছে।

এছাড়াও ইনফোসিস, অ্যাক্সিস ব্যাঙ্ক, আইসিআইসিআই ব্যাঙ্ক, আলট্রাটেক সিমেন্ট, রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ, এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক, কোটাক মাহিন্দ্রা ব্যাঙ্ক, সান ফার্মা এবং টেক মাহিন্দ্রার মতো হেভিওয়েট সংস্থাগুলির শেয়ারের দরও ১ শতাংশের বেশি দুর্বল হয়েছে। এর বিপরীতে অবশ্য ব্যতিক্রম হিসেবে টাইটান, মারুতি সুজুকি এবং ইটার্নালের শেয়ারের দর সামান্য ঊর্ধ্বমুখী থেকে ইতিবাচক ধারায় লেনদেন ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। তবে সামগ্রিক বাজার চিত্র ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক।

দিনের শুরুতেই কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টা দেখালেও বুধবার বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বৃহত্তর বাজার এক ধাক্কায় তীব্র নেতিবাচক ধারায় নেমে আসে। নিফটি স্মলক্যাপ ১০০ এবং নিফটি মিডক্যাপ ১০০-র মতো মাঝারি ও ছোট পুঁজির সূচকগুলিও প্রত্যেকে প্রায় ১ শতাংশ করে বড়সড় পতন দেখেছে। যার ফলে সামগ্রিক বাজার মনোভাব অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জে (এনএসই) এদিন মোট ২,১৬৫টি কোম্পানির শেয়ারের দর পতন দেখেছে, যেখানে মাত্র ৮০২টি শেয়ারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং ৮২টি শেয়ারের দর অপরিবর্তিত ছিল।

দালাল স্ট্রিটে চলমান এই ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের পরিবেশের মধ্যে বাজারের অস্থিরতা মাপার জনপ্রিয় পরিমাপক ‘ইন্ডিয়া ভিআইএক্স’ (India VIX) সূচক ৪ শতাংশের বেশি লাফিয়ে সোজা ১৩.১৪ পয়েন্টে গিয়ে ঠেকেছে। খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিফটি ফার্মা, নিফটি রিয়েলটি এবং নিফটি পিএসইউ ব্যাংক সূচক প্রতিটি প্রায় ২ শতাংশ করে ধসে পড়েছে, যা এগুলিকে আজকের ট্রেডিংয়ে সবচেয়ে বড় লোকসানের মুখে ঠেলে দিয়েছে। পাশাপাশি, নিফটি ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস, নিফটি ব্যাংক, নিফটি আইটি এবং নিফটি প্রাইভেট ব্যাংক সহ আরও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক ১ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে।

এই রক্তক্ষয়ী পতনের পেছনে মূলত কয়েকটি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হল ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দিন দিন বাড়তে থাকা তীব্র উত্তেজনা। গত মঙ্গলবার সৌদি আরব থেকে এশিয়াগামী তিনটি বিশাল তেল ট্যাঙ্কার লোহিত সাগরে তাদের পূর্বনির্ধারিত গতিপথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুথি বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে লাগাতার হামলার হুমকির ফলেই এই পরিবর্তন ঘটে বলে জানা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই ক্রমবর্ধমান যুদ্ধাবস্থা বিশ্বের অন্যতম প্রধান দুটি জ্বালানি সরবরাহ রুটকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। ইরান ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার সরাসরি হুমকি দিয়েছে। এর ফলে সৌদি আরবের দৈনিক লক্ষ লক্ষ ব্যারেল তেলের জন্য লোহিত সাগরই একমাত্র প্রধান বিকল্প পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার মাধ্যমে ইরান সংকট সমাধানে আগ্রহী, তবে তিনি এও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তেহরান এই বিষয়ে আদৌ আন্তরিক নয়।

মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন রণক্ষেত্রের আবহে সরবরাহ আরও বেশি ব্যাহত হওয়ার প্রবল আশঙ্কায় বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দুই মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছে। ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারস প্রতি ব্যারেল ৯২ মার্কিন ডলারের উপরে লেনদেন হয়েছে, এবং ডব্লিউটিআই ক্রুড ফিউচারস প্রতি ব্যারেল ৮৫ ডলারের গণ্ডি পার করেছে। প্রখ্যাত বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাক্স সম্প্রতি তাদের এক গবেষণামূলক প্রতিবেদনে তীব্র সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত প্রশমিত হবে বলে আশা করা হলেও, যদি হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়া অব্যাহত থাকে, তবে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে।

এর পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন আক্রমণাত্মক শুল্ক নীতি আবারও বিশ্ব বাজারকে নাড়িয়ে দিয়েছে। গত মঙ্গলবার আমদানি করা জেনেরিক ওষুধের ওপর একটি পর্যায়ক্রমিক ও চড়া শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা ঘোষণা করার পর থেকেই বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের ঘুম উড়ে গেছে। গত বছর হোয়াইট হাউসে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক সংক্রান্ত বারবার বদলে যাওয়া অবস্থান বিশ্ব বাণিজ্যে বারবার বড় ধাক্কা দিয়েছে। এই নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ আগস্ট থেকে শুরু করে পরবর্তী দুই বছরের জন্য মার্কিন মুলুকে প্রবেশকারী জেনেরিক ওষুধ শুল্কমুক্ত থাকবে। কিন্তু এর ঠিক পরেই আমদানির উপর প্রথম এক বছরের জন্য ১০০ শতাংশ এবং পরবর্তী সময়ে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত আকাশছোঁয়া শুল্ক চাপানো হবে। এই ঘোষণামাত্রই ফার্মাসিউটিক্যাল স্টকগুলিতে প্রবল বিক্রির বান ডাকে। লুপিন, পিরামাল ফার্মা, গ্লেনমার্ক এবং সিপলার মতো বড় বড় ফার্মা কোম্পানির শেয়ারের দর ৪ শতাংশ পর্যন্ত ধসে পড়ে, যা গোটা নিফটি ফার্মা সূচককে প্রায় ২ শতাংশ নিচে নামিয়ে আনতে বাধ্য করে।

অন্যদিকে, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের পলিসি নিয়েও বাজারে নানা জল্পনা চলছে। রয়টার্সের সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বিশ্বব্যাপী জরিপ অনুসারে, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ চলতি বছরের বাকি সময়টার জন্য তাদের মূল সুদের হার বর্তমান স্তরেই অপরিবর্তিত রাখতে পারে। তবে এই বছর সুদের হার আরও বাড়তে পারে কি না, সেই সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ ও উত্তরদাতা এটিকে “উচ্চ” সম্ভাবনা হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। যা গত মাসের সমীক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি তুলে ধরেছে। ফিউচার মার্কেট প্ল্যাটফর্ম ‘পলিমার্কেটস’-এও চলতি বছরের শেষ দিকে ফেডের সুদের হার বাড়ানোর জল্পনা এক লাফে অনেকটাই বেড়ে গেছে। এমনকি সিএমই গ্রুপের ফেডওয়াচ টুল এখন সুদের হার বৃদ্ধির ২৭ শতাংশ সম্ভাবনা নির্দেশ করছে।

এই বহুমুখী চাপে পড়ে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারেও ভারতীয় টাকার বড় পতন ঘটেছে। বুধবার মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপি ১১ পয়সা দুর্বল হয়ে ৯৬.৩৬ টাকার স্তরে লেনদেন শুরু করে প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের চড়া দাম বৃদ্ধি এবং বিশ্বজুড়ে নিরাপদ বিনিয়োগের সম্পদ বা সেফ হেভেনের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে মার্কিন ডলার আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এলকেপি সিকিউরিটিজের কমোডিটি অ্যান্ড কারেন্সি রিসার্চ অ্যানালিস্ট যতীন ত্রিবেদী এই বিষয়ে নিজের বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। পরিশেষে বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট পরামর্শ, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই বাজারে অর্থ বিনিয়োগের আগে অবশ্যই অভিজ্ঞ আর্থিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।